ইরান, ইজরায়েল, আমেরিকা এবং তেল। পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধের পেছনের আসল কারণটা কি? মোবাইলে পড়ার জন্য স্ক্রল করুন একটু নিচে ...

তেলের রাজনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের আগুন জ্বললে তার ধোঁয়া শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বোমা বিধ্বস্ত শহরের উপরেই ভাসে না— তা এসে লাগে কলকাতার রান্নাঘরে, দিল্লির জ্বালানি বিলে, ইউরোপের গ্যাস পাইপলাইনেও। আজ সারা পৃথিবীর মানুষ যে-ঘটনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত এবং প্রত্যক্ষ ভাবে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন, তা হল আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা ভয়াবহ – মৃত্যু এবং ধ্বংসের এক ভয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয়। এই মানবিক বিপর্যয়ের নেপথ্যে আছে এক দীর্ঘ, ঠান্ডা মাথার হিসেবি তেলের রাজনীতি।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম তেল আবিষ্কার হয় ইরানে, ২৬ মে ১৯০৮ সালে, বর্মা ওয়েল কোম্পানির হাত ধরে। তখন দেশটির নাম ছিল পারস্য। পরে ইরাক, বাহরিন, সৌদি আরব— একে একে গোটা অঞ্চল হয়ে ওঠে জ্বালানির ভান্ডার। ১৯৩৮ সালে সৌদি আরবে নিয়মিত তেল উত্তোলন শুরু হয়— বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে। সেই সময় থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতিতে তেল একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর হতে চলেছে। সারা পৃথিবী বুঝতে শুরু করে যে বিশ্বের তেলের ভান্ডার-এর উপরে যে দেশের আধিপত্য থাকবে সেই দেশই বিশ্বের রাজনীতি এবং অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

এই রাজনীতির এক মোক্ষম মোড় আসে ১৯৭৪ সালে। আমেরিকা এবং সৌদি আরবের মধ্যে যে সমঝোতা তৈরি হয়, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ডলার। শর্ত ছিল, তেল বিক্রি হবে মূলত আমেরিকান ডলারের বিনিময়ে; আর তেল বিক্রির উদ্বৃত্ত অর্থের বড় অংশ ঘুরে ফিরে যাবে আমেরিকান আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে, বিশেষত ট্রেজারি বন্ডে। বিনিময়ে সৌদি পাবে সামরিক সুরক্ষা। এই ব্যবস্থার ফলে তেল আর শুধু জ্বালানি রইল না; তা হয়ে উঠল ডলারের আন্তর্জাতিক আধিপত্য রক্ষার স্তম্ভ। পৃথিবীর যে-দেশ তেল কিনবে, তাকে ডলার জোগাড় করতেই হবে। অর্থাৎ জ্বালানির প্রয়োজনকে ব্যবহার করে মুদ্রার উপরেও প্রতিষ্ঠিত হল এক বিশ্বজোড়া নিয়ন্ত্রণ।

এই ব্যবস্থাকে অনেকে পেট্রোডলার বলেই চেনেন। তার প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, বহু দেশের বৈদেশিক মুদ্রানীতি, রফতানি হিসেব, এমনকি কূটনৈতিক অবস্থানও নির্ধারিত হতে শুরু করে তেল কেনার সক্ষমতা দিয়ে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। পঞ্চাশ বছরের সেই চুক্তি শেষ হয়েছে ৯ জুন ২০২৪-এ, কিন্তু সৌদি আরব তা এখনো নবীকরণ করে নি। এবারে বলা যাক এক অদ্ভুত সমাপতন এর ব্যাপারে। তেলের ভান্ডার আছে এমন কোন দেশ যখনই ডলারের বদলে বিকল্প কোনো মুদ্রায় তেল বেচাকেনার আভাস দেখা দিয়েছে, তখনই বিশ্বরাজনীতিতে অস্বস্তির স্রোত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গালফ স্টেট বলে যারা পরিচিত সেইসব দেশে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। এর আগে একবার ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইউরোর বিনিময়ে তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিলেন— যা পেট্রোডলার ব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা ছিল। অনেকের মতে, আমেরিকা ইরাকের বিরুদ্ধে বেআইনি আণবিক অস্ত্র মজুদ করার মিথ্যে অভিযোগ করে যে প্রথম ও দ্বিতীয় খাঁড়ি যুদ্ধ (১৯৯২ ও ২০০৩) করেছিল এবং সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করেছিল তা এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেরই অংশ ছিল।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষ সেই ধারারই প্রতিফলন। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন আক্রমণ, ২ মার্চ ইরানের পাল্টা হামলা— মিসাইল পড়ল সৌদি আরামকোর মালিকানাধীন সৌদি আরবের রাস তনুরার রিফাইনারিতে, বন্ধ হল কাতার এনার্জির রাস লাফান এলএনজি প্লান্ট। যে প্লান্ট থেকে সারা বিশ্বের ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ হয়। ফলে তেলের দাম ৭২ ডলার থেকে বেড়ে পৌঁছল ১১০ ডলারে।

কিন্তু ইরানকে দখল করার জন্য আমেরিকা এত উঠে পড়ে লাগল কেন?

এই পরিস্থিতিতে আবার উঠে এল ‘শেল তেল’-এর প্রসঙ্গ। শেল তেল হল কেরোজেন থেকে উত্তপ্ত করে তৈরি এক ধরনের অপ্রচলিত তেল, যার উত্তোলন প্রক্রিয়া ‘ফ্র্যাকিং’। এটি ব্যয়বহুল, পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর, এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এর আগে ২০০৮ সালে তেলের দাম ভয়াবহ উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তখন বিকল্প হিসেবে আমেরিকা শেল তেল উত্তোলনে জোর দেয়। কিন্তু শেল তেল বা ফ্র্যাকিং-নির্ভর উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত থাকে বিপুল খরচ। তেলের দাম বেশি থাকলে তা লাভজনক, দাম নেমে গেলে সমস্যায় পড়ে গোটা ব্যবস্থা। অর্থাৎ আমেরিকার নিজের জ্বালানি ক্ষেত্রেও স্থায়ী নিশ্চয়তা নেই। উপরন্তু, তাদের সব রিফাইনারি সব ধরনের অপরিশোধিত তেল শোধন করতে পারে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমানের ক্রুড আমদানি করার প্রয়োজন থেকেই যায়।

২০২৫-২৬ সালে এসে দেখা গেল আমেরিকার নিজস্ব তেল ভান্ডার কমছে। এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) জানাল মার্কিন ক্রুডের দাম ৬৫ ডলার থেকে নেমে ৫২ ডলারে আসতে পারে। এটা হওয়া স্বাভাবিকই ছিল কারণ যে হেতু সৌদির উচ্চমানের ক্রুড কিনতে আর ডলার লাগছে না, ক্রেতারা আর নিম্নমানের মার্কিন ক্রুড কিনতে চাইবে কেন? গভীর চিন্তার ভাঁজ দেখা গেল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কপালে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার দিকে ঝোঁকে। আমেরিকার সেনাবাহিনী ৩ জানুয়ারি আক্রমণ করে তুলে এনেছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে। ট্রাম্প কজা করে ফেলেছেন ভেনেজুয়েলার বিশাল তৈল ভান্ডার। হয়তো তাঁর মনে হয়েছিল পেট্রোডলার চুক্তি হাতছাড়া হলেও ভেনেজুয়েলার বিশাল তৈল ভান্ডার দখল করে সে-ক্ষতি তিনি পুষিয়ে নেবেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তিনি বুঝে গেলেন সে গুড়ে বালি। এবং বলা যায় আক্ষরিক অর্থে। কারণ আমেরিকার সব থেকে বড় তেল কোম্পানি এক্সন মোবিল জানিয়ে দিল ভেনেজুয়েলার তেলে তাদের কোনও আগ্রহ নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের বা রাশিয়ার ক্রুড যেখানে ‘লাইট ক্রুড’, সেখানে ভেনেজুয়েলার তেল ঘন, আঠালো, এবং অগভীর খনির কারণে মাইক্রোব আক্রমণে সালফারসমৃদ্ধ। এই তেল শোধন করতে গেলে বাতাসে বিপুল সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়— যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

এখানেই আসে নেলসন কমপ্লেক্সিটি ইনডেক্স (NCI)। পৃথিবীর অধিকাংশ রিফাইনারির এনসিআই ২-৪, কিন্তু এই ভেন ক্রুড শোধন করতে গেলে এনসিআই অন্তত ১০ বা তার বেশি দরকার। এই তেল পাম্প করে তোলা যায় না— আগে ন্যাপথা ও বাষ্প মিশিয়ে তা তরল করতে হয়।

ভেনেজুয়েলার ওরিনোকো বেসিনে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল থাকলেও তা কার্যত অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়ে। স্যাংশনের কারণে ন্যাপথা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, উৎপাদন কমে যায়, এবং বাজার হারিয়ে যায়। ফলে ভান্ডার বিশাল হলেও ক্রেতা নেই।

এই জায়গাতেই ভারতের প্রবেশ। ভারতের জামনগর, নায়রা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিগুলির এনসিআই ১০-১৩— ফলে এই কঠিন তেলও শোধন করা সম্ভব। ২০১৩ সালে ভারতের ১২ শতাংশ তেল ভেনেজুয়েলা থেকে আসত। পরে তা বন্ধ হলেও আবার শুরু হয়।

কিন্তু সমস্যা হল— এই তেল আসে ১০ হাজার নটিকাল মাইল দূর থেকে, কোনও ছাড় নেই, বরং রাশিয়ার তুলনায় ব্যারেল প্রতি ৫ ডলার বেশি খরচ। উপরন্তু শোধনের খরচ ও পরিবেশ দূষণ আলাদা।

ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ভারত রাশিয়া থেকে ছাড়ে তেল কিনে বিপুল লাভ করেছিল— আমদানি ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তেই ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে তা কমে যায়, এবং তার জায়গায় ঢুকে পড়ে ভেন ক্রুড।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প বুঝলেন— ‘তেল সম্রাট’ হতে গেলে নতুন উৎস দরকার। ইরাকে লাভ হয়নি— সেখানে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ও চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়ামের দখল। সৌদি-ওমান-ইউএই বন্ধু হলেও স্বাধীন। ফলে নজর পড়ে ইরানের দিকে— যেখানে ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত।

তুলনায় সৌদিতে ২৬৫ বিলিয়ন, রাশিয়ায় ৮০ বিলিয়ন, টেক্সাসে ৬ বিলিয়ন, গালফ অফ মেক্সিকোতে ২০ বিলিয়ন ব্যারেল। ফলে ইরানের তেল দখল মানেই নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি।

এই সময় এক্সন মোবিল পায়োনিয়র (৬০ বিলিয়ন ডলার) এবং শেভরন হেস কর্পোরেশন (৫৩ বিলিয়ন ডলার) কিনে নেয়— স্পষ্ট বার্তা, তেলের দখলই ভবিষ্যতের ক্ষমতা।

ভারতের বাজারও তাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই বাজার ধরে রাখতে না পারলে সমস্যা বাড়বে। তাই একদিকে চাপ, অন্যদিকে রাশিয়ার তেল সাময়িকভাবে অনুমোদন— সবই কৌশল।

কিন্তু এই বিশাল খেলায় সবচেয়ে নির্মম দিক হল মানবিক মূল্য। স্কুলে টমাহক পড়ছে, মানুষ মরছে— আর তাকে বলা হচ্ছে ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’। যুদ্ধ শেষে পুনর্গঠনের বরাত যাচ্ছে বেকটেলের মতো আমেরিকান সংস্থার হাতে। ধ্বংসও ব্যবসা, পুনর্গঠনও ব্যবসা।

তেলের রাজনীতি তাই কেবল জ্বালানির গল্প নয়— এটি ক্ষমতার, অর্থনীতির, যুদ্ধের এবং মানবিক বিপর্যয়ের গল্প।

শেষ প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়—
রক্ত মাংস ছাড়া তেল হবে কী করে?

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search