বিশ্বাসঘাতক!
লোকটা অবশ্যই চর। রাশিয়ার চর । ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা, এম আই ফাইভ, এর এ বিষয়ে সংশয় ছিল না বললেই চলে। অথচ বিপদ অন্য জায়গায়। আদালতে দাঁড় করিয়ে এই অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে, এমন শক্তপোক্ত প্রমাণ কিছুতেই হাতে আসছে না। খুঁজতে খুঁজতে গোয়েন্দারা ক্লান্ত, বিরক্ত, প্রায় দিশেহারা।
যাঁকে ঘিরে এত উদ্বেগ, তিনি তখন ইংল্যান্ডের হারওয়েলে পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্রের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছেন। বয়স সাঁইত্রিশ। নাম ক্লাউস ফুকস। তার আগে তিনি ছিলেন আমেরিকায়, ইতিহাসখ্যাত গোপন ম্যানহাটন প্রোজেক্টে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে অনেক দিন। এও তত দিনে জানা গিয়েছে যে, পরমাণু বোমা তৈরির ক্ষেত্রে ক্লাউস ফুকসের অবদান ছিল নির্ণায়ক। বোমার ‘ক্রিটিক্যাল সাইজ়’ নির্ধারণের জন্য যে গাণিতিক মডেল প্রয়োজন, সেটাই তৈরি করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ বিস্ফোরণ ঘটাতে গেলে বোমার আয়তন কতখানি হওয়া চাই, সেই অঙ্কটি কষে দিয়েছিলেন ফুকস। ফলে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্রিটেনে তিনি তখন সম্মানিত, প্রশংসিত, প্রায় নায়কের মর্যাদাপ্রাপ্ত। এমআই৫ তাঁর কমিউনিস্ট অতীত সম্পর্কে অবহিত ছিল। তবু তাঁকে নিরাপত্তাজনিত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। হারওয়েলের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও তাঁর হাতেই তোলা হয়।
কর্মক্ষেত্রে এবং ব্যক্তিগত মেলামেশায়, ক্লাউস ফুকস ছিলেন নিখুঁত ভদ্রলোকের প্রতিমূর্তি। শান্ত, সংযত, একাকীত্বপ্রিয়। কেউ যদি তাঁকে কোনও গভীর বা জটিল প্রশ্ন করত, তিনি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতেন না। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতেন, যেন নিজের ভেতরে কোথাও হিসেব কষছেন। তারপর হঠাৎই একটি ছোট, মাপা, অথচ নির্ভুল উত্তর। নিজে থেকে গল্প জুড়ে দেওয়ার লোক তিনি নন। কিন্তু হারওয়েলে তাঁর সহকর্মী, এমনকি তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। কে বিদেশ থেকে কী পছন্দ করবে, কার বাড়ির শিশুর জন্য খেলনা আনতে হবে, কার সদ্যোজাতের জন্য প্র্যাম— এসব ছোটখাটো খুঁটিনাটি তাঁর মনে থাকত অবিকল।
ক্লাউস ফুকসের জীবন যেন এক টানটান থ্রিলার। এখন তিনি ব্রিটিশ নাগরিক, কিন্তু তাঁর জন্ম জার্মানিতে। বাবা ছিলেন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ, আবার একনিষ্ঠ সমাজতন্ত্রীও। সেই পারিবারিক প্রভাবেই ছাত্রাবস্থায় ফুকস কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তরুণ বয়সে তিনি ছিলেন দাপুটে ছাত্রনেতা। ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা ক্ষমতায় আসার পর বিরোধীদের বিরুদ্ধে শুরু হয় দমনপীড়ন। প্রাণ হাতে করে ফুকস প্রথমে ফ্রান্সে, তারপর ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান।
রাজনীতির টান ছিল, কিন্তু মেধার অভাব ছিল না একটুও। ইংল্যান্ডে এসে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট সম্পূর্ণ করেন। কাজ করেন ম্যাক্স বর্নের মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর সঙ্গে। এর মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ব্রিটেন তাঁকে নিজেদের পারমাণবিক গবেষণার কাজে লাগায়। ১৯৪৩ সালে সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় আমেরিকায়। জাহাজে চেপে ইংল্যান্ড ছাড়ার সময়ও তিনি জানতেন শুধু এইটুকু— তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন এক সামরিক বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে কাজে লাগানো হবে। এর আগেই অবশ্য সোভিয়েত গোয়েন্দাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকায় তাঁর এই গোপন যাত্রার খবর তারাও পেয়ে গিয়েছিল। অপেক্ষা ছিল, কবে ফুকস প্রকল্পের অন্তঃসারটি তাদের হাতে তুলে দেবেন।
সব দিক বিচার করলে গোয়েন্দারা প্রায় নিশ্চিত— ফুকস কিছু না কিছু করেছেন। কিন্তু সেই ‘কিছু’টাকে আইনের ভাষায় প্রমাণ করা যাচ্ছে না। বলপ্রয়োগে লাভ নেই, তা বোঝাই যাচ্ছিল। এমন বিচক্ষণ, এমন স্বল্পভাষী মানুষকে চাপ দিয়ে কথা বের করা কঠিন। তাঁর সহকর্মীদের কাছে তো অভিযোগটাই প্রায় অবিশ্বাস্য। তাঁরা আঁতকে উঠে বলতেন, “না না, ক্লাউস এ কাজ করতে পারেন না। ওঁকে আপনি চেনেন না!”
এই পরিস্থিতিতেই এমআই৫-এর শীর্ষ মহলে ডাকা হল জিম স্কার্ডনকে। বাকপটু, ধৈর্যশীল, জেরা-বিদ্যায় সিদ্ধহস্ত। অনেকে মনে করতেন, ফুকসের মতো লোকের কাছ থেকে সত্য টেনে বের করতে হলে স্কার্ডনের মতো লোকই চাই। তবে সংশয়ও কম ছিল না। এত ধুরন্ধর এক বিজ্ঞানী কেন তাঁর অন্তরের গোপন কথাগুলো এমন এক ব্যক্তিকে বলবেন, যাঁকে তিনি আদৌ চেনেন না?
“মিস্টার ফুকস, আমি জিম স্কার্ডন। নিরাপত্তা দফতর থেকে এসেছি। আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই আমাকে পাঠানো হয়েছে। কিছু রুটিন প্রশ্ন ছিল।”
ফুকসের অফিসে গিয়ে নিজের পরিচয় এই ভাবেই দিয়েছিলেন স্কার্ডন। দিনটি ১৯৪৯ সালের ২১ ডিসেম্বর। ফুকসের টেবিল-ক্যালেন্ডারে সেই তারিখই লেখা ছিল। তারপর শুরু হল আসা-যাওয়া। স্কার্ডন নিয়মিত যেতে লাগলেন। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন ফুকসের নিকটজনদের একজন। দীর্ঘ আড্ডা, একসঙ্গে চা, অতীতের গল্প, বর্তমান রাজনীতি, মতাদর্শ, ব্যক্তিগত স্মৃতি— সবই মন দিয়ে শুনতেন স্কার্ডন। ফুকসের কমিউনিস্ট বিশ্বাস নিয়েও কৌতূহল দেখাতেন অকপটে। আশপাশের সকলের সঙ্গে ফুকস ভদ্রভাবে মিশতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মনের ভিতরে যে এক অদৃশ্য টানাপড়েন চলছিল, তার খবর নিতে চেয়েছিলেন সম্ভবত একমাত্র জিম স্কার্ডনই।
ফলে পরিচয়ের এক মাস পূর্ণ হয়েছে কি হয়নি, ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি, দুপুরের খাওয়ার পর ফুকস হঠাৎ স্কার্ডনকে বলে উঠলেন, “জানো স্কার্ডন, আমি যা করেছি, তার জন্য আমি অনুতপ্ত নই। তবে এ-ও জানি, আমি আইন ভেঙেছি।”
“আপনার নিরাপত্তার খাতিরে”— এই অজুহাতে স্কার্ডন ফুকসের সঙ্গে কথাবার্তার সব কিছুরই নোট রাখতেন। সে দিন তাঁকে দীর্ঘ নোট লিখতে হয়েছিল। নাৎসিদের তাড়ায় একদা জার্মানি ছেড়ে পালানো, আমেরিকার পরমাণু বোমা প্রকল্পের উজ্জ্বল সদস্য, বর্তমানে ব্রিটিশ নাগরিক— সেই ক্লাউস ফুকস স্বীকার করলেন, পারমাণবিক বোমা তৈরির বহু গোপন তথ্য তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়েছেন। কেন করেছেন, তার ব্যাখ্যাও দিলেন।
সেই ব্যাখ্যায় অবশ্য বিচারক বা সরকার কাউকেই সন্তুষ্ট করা যায়নি। ফুকস বোধহয় ভেবেছিলেন, সব সত্যি খুলে বললে ব্রিটিশরা তাঁর সততাকে গুরুত্ব দেবে। স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরে তিনি স্কার্ডনকে সরল বিশ্বাসে জিজ্ঞেসও করেছিলেন, “তা হলে কি আমি হারওয়েলে কাজ চালিয়ে যেতে পারব?”
স্কার্ডন দক্ষতার সঙ্গে উত্তর এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তবে জবাব পেতে ফুকসকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। ২৪ জানুয়ারি তিনি জবানবন্দিতে সই করলেন। ঠিক ন’দিন পরে, ২ ফেব্রুয়ারি, তাঁকে গ্রেফতার করা হল। এই ক’দিনে যাচাই করা হয়েছিল, শুধু লিখিত স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই তাঁকে বন্দি করা যাবে কি না। যখন জানা গেল, যাবে— আর দেরি হয়নি।
বিশ্ব-ইতিহাসে এত গুরুতর পারমাণবিক গুপ্তচরবৃত্তির মামলা তখন বিরল। ফলে দ্রুতই আদালতে শুনানি শুরু হয়। মার্চ মাসের প্রথম দিন সকালবেলায় বিচার শুরু। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ফুকস অভিযোগ স্বীকার করে নিলেন। ফলত, এত বড় মামলার নিষ্পত্তি হতে সময় লাগল মাত্র নব্বই মিনিট। ব্রিটিশ অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট অনুযায়ী তাঁকে দেওয়া হল সে সময়ের সর্বোচ্চ শাস্তি— চোদ্দো বছরের কারাদণ্ড।
পরে জানা যায়, ফুকস রাশিয়ার হাতে এমন বিস্তারিত নকশা ও তথ্য তুলে দিয়েছিলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম পরমাণু বোমাটি দেখতে প্রায় হুবহু আমেরিকার ‘ফ্যাটম্যান’-এর মতো হয়েছিল। কেন তিনি ১৯৪১ সাল থেকেই এই গোপন তথ্য পাচার করতে শুরু করেছিলেন? আত্মপক্ষ সমর্থনে তাঁর যুক্তি ছিল মূলত দু’টি। এক, পারমাণবিক শক্তির উপর পশ্চিমি দুনিয়ার একচ্ছত্র দখল থাকা উচিত নয়। দুই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়াও যেহেতু মিত্রশক্তির অংশ ছিল, তাই এই অস্ত্র সম্পর্কে তাদের জানার অধিকার ছিল। ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থা এই ব্যাখ্যায় প্রশমিত হয়নি, বলাই বাহুল্য।
জাপানে পরমাণু বোমা ফেলা উচিত ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আজও থামেনি। এক সময়ে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে চিঠি লিখে সতর্ক করেছিলেন— নাৎসি জার্মানি যদি সত্যিই পরমাণু বোমা বানানোর চেষ্টা করে, তবে আমেরিকারও অবিলম্বে গবেষণা শুরু করা দরকার। কিন্তু পরবর্তীকালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে সেই বোমা নিক্ষেপের খবর শুনে আইনস্টাইন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অনুতপ্ত ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, যদি উভয় পক্ষের হাতেই সমশক্তির অস্ত্র থাকে, তবে কেউই তা ব্যবহার করতে সাহস পাবে না।
ক্লাউস ফুকসও এক অর্থে সেই যুক্তিতেই বিশ্বাস করতেন। তাঁরও ইচ্ছে ছিল, এই ভয়াবহ শক্তি এক পক্ষের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে না থাকুক। তবে পার্থক্য হল, তিনি এই তথ্য শত্রুপক্ষকে নয়, সেই সময়কার মিত্র দেশ রাশিয়াকে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাটা প্রকাশ্যে আসার পর আমেরিকা ও ব্রিটেন দুই দেশই প্রবলভাবে ক্ষুব্ধ হয়। সাজা ঘোষণার সময় বিচারক তাঁকে বলেছিলেন, “আপনি অসাধারণ মেধাবী হয়েও, আপনার প্রতি রাখা বিশ্বাসের গভীর অবমাননা করেছেন।”
আমেরিকার হিসেব ছিল, রাশিয়া অন্তত পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পরমাণু বোমা তৈরি করতে পারবে না। সেই সময়টুকু হাতে রেখে এই অস্ত্রের ভীতি দেখিয়ে বাকি পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। ফুকসের গোপন তথ্য পাচারের কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ সালের অগস্টেই তাদের প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলল। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এর ফলেই ঠান্ডা যুদ্ধ আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।
ফিরে আসা যাক ফুকসের ব্যক্তিজীবনে। ১ মার্চ যে মানুষটিকে চোদ্দো বছরের সাজা দেওয়া হয়েছিল, ভাল ব্যবহারের জন্য তিনি মুক্তি পান ন’বছরেই। কারাগারে তাঁর দায়িত্ব ছিল গ্রন্থাগারের। বই গুছিয়ে রাখা, বন্দিদের বই বিলি করা, পড়ানো— এসবই করতেন। নিজের বৈজ্ঞানিক আগ্রহও ছাড়েননি। পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে তাঁকে কাগজ-কলম দেওয়ার ক্ষেত্রে জেল কর্তৃপক্ষ ছিল অত্যন্ত সতর্ক। ভয় ছিল, আবার না কোনও লেখা বাইরে পাচার হয়ে যায়।
কাজের সময় বাদ দিলে তিনি বেশির ভাগ সময় একাই থাকতেন। স্কার্ডনকে দেওয়া জবানবন্দিতে ফুকস জানিয়েছিলেন, তাঁর ‘কন্ট্রোলড স্কিৎজ়োফ্রেনিয়া’ ছিল। নিজের মনকে যেন তিনি দুই ভাগে ভেঙে নিয়েছিলেন। এক দিকে তিনি বিশ্বস্ত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী, অন্য দিকে আদর্শনিষ্ঠ কমিউনিস্ট। এই দুই সত্তার টানাপড়েনেই তিনি বছরের পর বছর মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই চাপই হয়তো তাঁকে স্কার্ডনের কাছে সত্য স্বীকার করতে বাধ্য করেছিল।
আমেরিকায় কার হাতে তিনি ম্যানহাটন প্রোজেক্টের গোপন নথি তুলে দিতেন? নাম বলেননি তিনি। তবে বাহ্যিক চেহারার এমন বর্ণনা দিয়েছিলেন, যাতে সেই ব্যক্তিকে পরে শনাক্ত করা যায়। তারপর একে একে আরও কয়েক জন ধরা পড়ে। কারও কারাদণ্ড হয়, কাউকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়। নিজের স্বীকারোক্তির ফলে অন্যদের এই পরিণতির খবর পেলে জেলে বসে ভেঙে পড়তেন ফুকস। ব্রিটিশ ও আমেরিকান গোয়েন্দারাও আশায় ছিল— হয়তো তিনি আরও নাম বলবেন। কিন্তু তত দিনে তিনি গুটিয়ে গিয়েছেন সম্পূর্ণ। এমনিতেই কম কথার মানুষ, এরপর আরও নীরব হয়ে গেলেন।
ক্লাউস ফুকস— তিনি কি বিশ্বাসঘাতক? না কি এক জন মানবতাবাদী?
১৯৫৯ সালের ২৩ জুন জেল থেকে বেরিয়ে তিনি জানতে পারলেন, তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। সোজা উড়ে গেলেন সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানিতে। বার্লিন বিমানবন্দরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানানো হবে— খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর বাবা এমিল ফুকস। নাৎসিদের নির্মম অত্যাচারের মধ্যেও যিনি দেশ ছাড়েননি। বহু বছর কেটে গিয়েছে। পলাতক ছেলের সঙ্গে তাঁর দেখা হবে ছাব্বিশ বছর পরে। জনতার উচ্ছ্বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে, ছেলেকে এখনও চোখে না-দেখেও, গর্ব আর আবেগে তাঁর বুক ভরে উঠছিল। আর ক্লাউস তখন বলছিলেন, “ব্রিটেন বা ব্রিটিশ জনগণের প্রতি আমার কোনও বিদ্বেষ নেই। কিন্তু আমি আমার আদর্শের কাছে দায়বদ্ধ।”
এর পরের জীবন পূর্ব জার্মানিতেই কাটান ফুকস। বিয়ে করেন, সংসারী হন। বাবার সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বুকে নিয়েই সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ১৯৮৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ক্লাউস ফুকস আজও বিশ্বাসঘাতক— কারণ তিনি তাঁর উপর অর্পিত আস্থাকে ভেঙে গোপন তথ্য বিদেশে সরিয়েছিলেন। কিন্তু রাশিয়া ও প্রাক্তন পূর্ব জার্মানির চোখে তিনি নায়ক। কারণ তিনি বৈজ্ঞানিক তথ্য ভাগ করে নিয়েছিলেন, তাও কোনও অর্থলোভে নয়। করেছিলেন নিজের মতাদর্শের দায় মেনে। প্রশ্নটা তাই সহজ নয়। হিরোশিমা ও নাগাসাকির পর পৃথিবীর আর কোনও শহরে পরমাণু বোমা না-ফেলার ইতিহাসে ক্লাউস ফুকসের ভূমিকাও কি কোনও না কোনও ভাবে ধরা থাকবে না?
প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। আর সেই কারণেই, তা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।





