ব্যাঙের জীবন্ত কোষ আর তার সাথে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এর অ্যালরিদগম, মিলেমিশে... কি হল? জানতে হলে পড়ুন। মোবাইলে পড়তে হলে স্ক্রল করুন নিচে...

জেনোবটের সন্তান

সেই আশির দশকের জনপ্রিয় ভিডিও গেম প্যাকম্যানের কথা মনে আছে। খোলা বন্ধ হতে থাকা হাঁ দিয়ে সামনে থাকা খাবার খেতে খেতে এগিয়ে চলত স্ক্রিনের মাঝের গোলকধাঁধায় ভরা অলিগলি দিয়ে। আধুনিক গ্রাফিক্সের দুনিয়া হয়ত সেই খেলাটা ভুলিয়ে দিতে পারে কিন্তু সেই প্যাকম্যানের কায়দা আবার ফিরে এসেছে রোবটের প্রজননে। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনছেন রোবটের প্রজনন। তাদের দ্বারাও সন্তান উৎপাদন সম্ভব। এমনটাই দাবি করেছেন একদল বিজ্ঞানী। এই মর্মে তাদের গবেষণা সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের জার্নালে।

তা হলে কি এ বার ভাবতে বসলেন আপনার আত্মীয়দের বাচ্চাদের মত রোবটের সন্তানের অন্নপ্রাশনে খেতে গিয়ে কি গিফট দেওয়া যায়? তা হলে বলব অতটাও চিন্তার দরকার নেই, সবার আগে সেই সন্তান জন্মদেওয়া রোবটের সাথে ভালো করে পরিচয় করে নিন।

এই গবেষণায় ব্যবহৃত রোবট সিনেমায় দেখা বা আপনার কল্পনায় ভেসে ওঠা যন্ত্রপাতি আর কলকব্জা সমেত বিশাল কিছু নয়। নেহাতই এক মিলিমিটারের থেকেও ছোট ‘জেনোবট’ দিয়েই এই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়েছেন আমেরিকার বিজ্ঞানীরা। ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্টের গবেষক জোশুয়া বোনগার্ডের কথায়, ‘আমাদের রোবট সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বদলে যাবে এই জীবন্ত কোষ দিয়ে তৈরি জেনোবটকে বুঝতে গেলে। এই রোবট আসলে তৈরি আফ্রিকার বিশেষ নখওয়ালা ব্যাঙ জেনোপাস লেভিসের শরীরের এক বিশেষ ধরনের কোষ নিয়ে।’

এই জেনোপাস নাম থেকেই এসেছে জেনোবট কথাটি। ব্যাঙাচি থাকাকালীন এই কোষগুলিই তাদের শরীরের বাইরে তৈরি করে আবরণ। ধীরে ধীরে পরিণত অবস্থায় তা ব্যাঙটির চামড়ার কোষে পরিণত নয়। কিন্তু এই কোষগুলোকেই যখন ব্যাঙের শরীর থেকে বের করে বিশেষ ভাবে প্রোগ্রামিং করা পরিবেশে রাখা হয় তখন তারাই শুরু করে অন্য খেলা।

২০২০ সালের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা দেখেছিলেন, নিজে থেকেই বড় হতে বা নিজেদের ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারছে এই বিশেষ কোষগুলি। আবার হাজারে হাজারে একত্রিত হয়ে কোনও বিশেষ কাজ করে ফেলার ক্ষমতাও রয়েছে তাদের মধ্যে। তা হলে কি এদের দিয়ে বিশেষ প্রোগ্রামিঙের সাহায্যে করিয়ে নেওয়া যেতে পারে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজ? চামড়ার বাইরে এসে ব্যাঙের ওই স্টেম সেল সে দিন থেকেই খোঁজ দিচ্ছিল এক নতুন সম্ভাবনার।

এ বার আপনি ভাবতেই পারেন সব কিছুই তো জীবন্ত কোষ নিয়ে গবেষণা। আর জীবন্ত কোষ তো আরও কোষ তৈরি করতে পারবেই। এর সাথে রোবটকে জুরে দেওয়ার মানে কী? আসলে প্রোগ্রামিঙের মাধ্যমে যদি কোনও জড়পদার্থ বা জীবন্ত কোষকে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট কাজ করিয়ে নেওয়া যায় এবং বিশেষ পরিবেশে সেই কোষ যদি সেই কাজ নিজে থেকেই করতে পারে। তা হলে তাকে রোবট বলতে কোনও বাধা নেই গবেষকদের। যেমন এখানে ব্যাঙের চামড়ার কোষ হয়েও এই জেনোবটরা কম্পিউটারের বিশেষ অ্যালগরিদমের সাহায্যে বংশবিস্তার করে চলেছে বিপুল পরিমাণে। তবে সব কোষের কিন্তু এই ক্ষমতা নেই। আর এখানেই সুপার কম্পিউটারের কেরামতি যা এই নিছক চামড়ার কোষকে দিয়েছে রোবটের তকমা।

ONE XENOBOT

সুপার কম্পিউটারের এক বিশেষ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে খুঁজে ফেরা হচ্ছিল কিছু বিশেষ আকারের কোষ যারা কি না সঠিক পরিবেশে নিজের মতোই কোষ তৈরি করতে পারবে। দিনের পর দিন মাথা ঘামিয়ে অবশেষে সুপার কম্পিউটার খুঁজে বের করল আমাদের ছেলেবেলার ফেলে আসা প্যাকম্যানের আকারের কোষকে। এরা নাকি তাদের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা স্টেম সেলদের গিলতে থাকে গোগ্রাসে। তারপর কয়েক হাজার কোষ খেয়ে যখন সে আকারে বড়সড় হয়ে উঠেছে তখনই ওই খেয়ে ফেলা কোষগুলি একত্রিত হয়ে জন্ম দেয় একটি নতুন জেনোবটের। এই প্রক্রিয়াই চলতে থাকে বারংবার। জন্ম নিতে থাকে বিপুল সংখ্যক জেনোবট। বিশেষ পরিবেশে এই জন্মহারকে কমানো বাড়ানোতেও সক্ষম এই ক্ষুদে রোবটেরা।

এই গবেষণার সম্ভাবনা দেখে এতে টাকা ঢেলেছে ডিফেন্স অ্যাডভান্স রিসার্চ প্রোজেক্ট এজেন্সির মতো সংস্থাও। তা হলে কি এবার প্রতিরক্ষার খেত্রেও এই ক্ষুদে রোবটের ব্যবহার হবে? সে ব্যপারে মুখ না খুললেও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী এই জেনোবটদের দিয়ে অনেক জটিল কাজ সহজে করিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে।

মহাসাগরে জমে থাকা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা যা জলজ প্রাণীদের জন্য দিনে দিনে বিভীষিকা হয়ে উঠছে সেই কণাগুলিকে সংগ্রহ করতে পারে এই ক্ষুদে রোবট। ওষুধ তৈরির আণুবীক্ষণিক স্তরের গবেষণাকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে এই ক্ষুদেরাই। এমন আরও অনেক জরুরি গবেষণাতেই এই জেনোবটদের হাত ধরে খুলে যেতে পারে নতুন দিগন্ত। তাই অন্নপ্রাশনে মুখে ভাত না দেওয়া গেলেও অনেক গবেষণার মুখেই হাসি ফোটাতে চলেছে এই রোবট সন্তানেরা।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

সামাজিক বিষয় থেকে বৈজ্ঞানিক বিষয় স্নেহা-র সাবলীল লিখনশৈলীতে পাঠকের কাছে তা সহজপাঠ্য।

Start typing and press Enter to search