তরুণদের ক্ষোভ থেকে জন্ম নিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। নামটা মজার, কিন্তু তাদের তোলা প্রশ্নগুলো নয়। আর সেই প্রশ্নই এখন শাসক-বিরোধী দুই পক্ষের অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। মোবাইলে পড়ার জন্য স্ক্রল করুন একটু নিচে...

গণতন্ত্র, আশঙ্কা এবং আরশোলা

আরশোলা জীবটি গণতান্ত্রিক নহে।

আপনার অনুমতি লইয়া সে বৈঠকখানায় ঢোকে না। সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে না। কপাটে মৃদু করাঘাত করিয়া বলে না, ‘আজ্ঞা মহাশয়, ভিতরে আসিতে পারি কি?’ বরং আপনি যখন নিশ্চিন্ত মনে ভাবিতেছেন ঘরখানি পরম পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন, ঠিক তখনই রেফ্রিজারেটরের অন্তরাল হইতে খাড়া দুইখানি শুঁড় দুলাইয়া সে বাহির হইয়া পড়ে।

ভারতবর্ষের বর্তমান রাজনীতিতেও ঠিক এই রূপ আরশোলাদের আবির্ভাব ঘটিতেছে। কাল পর্যন্ত মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের যে তরুণটি দেশের ভবিষ্যৎ অপেক্ষা নিজের মুঠোফোনের ব্যাটারির আয়ু কত শতাংশ অবশিষ্ট আছে তাহা লইয়া অধিক ভাবিত থাকিত, আজ সে সোজা রাজদপ্তরে গিয়া সরকারি হিসাবপত্র দাবি করিতেছে। কোন্ নীতির ফলে কোষাগারের কত লাভ হইল, সাধারণের কত ক্ষতি হইল, সেই ক্ষতির তলে দুর্নীতির কালো হাত লুকাইয়া আছে কি না—এমনতর অবাঞ্ছিত প্রশ্ন তুলিতেছে। গৃহকোণে বসিয়া অভিভাবকেরাও বিস্মিত নেত্রে দেখিতেছেন, যে সন্তান এতদিন নিজ জগতে মগ্ন থাকিত, রাজনীতিকে দূর হইতে পরিহার করিয়া চলিত, সে-ই এখন রাজ্যপাট লইয়া শিরঃপীড়া বাঁধাইতেছে। অর্থাৎ, নিঃশব্দে এক-একটি ‘অবাধ্য’ আরশোলায় রূপান্তরিত হইতেছে।

রাষ্ট্রের পক্ষে এই রূপ রূপান্তর কিছু কম আতঙ্কের নহে।

এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ অবশ্য এক রজনীতে জন্ম লয় নাই। পরীক্ষার পর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইতেছে, কিন্তু নিয়োগপত্র চিরতরে তামাদি হইয়া পড়িয়া আছে; কোথাও প্রশ্নপত্র বিক্রয় হইতেছে, কোথাও ফলাফলের প্রতীক্ষায় দিন গুজরান হইতেছে, কোথাও বা স্বজনপোষণের প্রকাশ্য মেলা বসিয়াছে। বিদ্যালাভের সনদ হস্তে লইয়া দ্বারে দ্বারে ঘুরিবার পর কদাচিৎ কর্ম জুটিলেও বেতন অতি সামান্য, আর না জুটিলে বয়সের সীমা উত্তীর্ণ হইবার অন্তহীন দুঃস্বপ্ন। তাহার সহিত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অন্যায় ব্যয়ভার, পেট্রলে ইথানল মিশ্রণের নেপথ্য কাহিনি, ফসলের ন্যায্য মূল্য হইতে কৃষকের বঞ্চনা এবং সর্বোপরি ক্ষমতার দম্ভ—সব মিলাইয়া অসন্তোষের হাঁড়িটি বহু কাল যাবৎ ধিকিধিকি আঁচে বসানোই ছিল।

সামাজিক মাধ্যম কেবল তাহার ঢাকনাখানি উল্টাইয়া দিয়াছে মাত্র। ইতিপূর্বে যে যুবাটি নিজ শয়নকক্ষে বসিয়া ভাবিত, ‘পোড়া কপাল বুঝি কেবল আমারই’, সে এখন অঙ্গুলি সঞ্চালনে সমাজমাধ্যমে দেখিতে পাইতেছে—না, পার্শ্ববর্তী সহনাগরিকের যন্ত্রণাও অভিন্ন। রাষ্ট্রের পক্ষে এই প্রত্যক্ষ দর্শন সুখকর হইবার কথা নহে। কেননা, ব্যক্তিগত হতাশা যতক্ষণ গৃহের চৌকাঠে আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ তাহা ‘ব্যক্তিগত সমস্যা’; কিন্তু সহস্র মানুষের সেই গোপন ক্ষোভ যখন একযোগে পরস্পরকে চিনিয়া ফেলে, তখনই তাহার নাম হয় ‘গণআন্দোলন’।

বস্তুত, যে নাগরিক রাজনীতি বিমুখ, সে হয়তো দেশের আদর্শ সন্তান নহে, কিন্তু রাজপুরুষদের চোখে পরম ‘নিরুপদ্রব’ জীব। পঞ্চবর্ষে একদিন ভোটকেন্দ্রে গিয়া অঙ্গুষ্ঠচিহ্ন দিয়া আসিবে, জাতীয় দিবসে পতাকার ছবি তুলিয়া ধন্য হইবে, চটকদার বিজ্ঞাপনী প্রচারে মুগ্ধ থাকিবে এবং অবশিষ্ট দিনগুলিতে নিজের ঋণের কিস্তি শোধের চিন্তায় জর্জরিত হইবে।

বিপদ বাঁধে ঠিক তখনই, যখন সেই নিরীহ মানুষটি অকস্মাৎ বুকপকেট হইতে পাটিগণিতের হিসাব বাহির করে।

কিন্তু ক্ষমতার দুর্ভাগ্য কেবল এইটুকুতেই সীমিত নহে। এই নবীন প্রজন্মের আরও একটি পরম গর্হিত অভ্যাস হইয়াছে—তাহারা মনুষ্যোচিত মর্যাদা দাবি করে। বিগত প্রজন্মের সমীকরণটি ছিল ভিন্ন। গৃহে পিতৃদেবের হস্ত এবং বিদ্যালয়ে পণ্ডিতমহাশয়ের বেত্র—উভয়ই চরিত্র গঠনের সর্বজনস্বীকৃত শাস্ত্রীয় পথ বলিয়া গণ্য হইত। বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তর্জনী তুলিলেই কনিষ্ঠটি ভয়ে জড়সড় হইবে—এই প্রথাই সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখিত।

বর্তমানের তরুণ সম্প্রদায় সেই ‘পাঠ’ গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিয়াছে। ফলে মহার্ঘ পদের অধিকারী মন্ত্রীবর্গকে সমুখে দেখিয়াও তাহাদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয় না, আর দেশের সর্বোচ্চ আসনটিকে লইয়া রসিকতা করিতেও বুক কাঁপে না। এই অসমসাহসী রূপ দেখিয়া সাবেক আমলের প্রবীণ ব্যক্তিরা এখনও সভয়ে ইতস্তত চাহিয়া দেখেন—নিকটে পুলিশ দাঁড়াইয়া নাই তো!

স্বাধীনতার পর হইতে রাষ্ট্র সম্ভবত এমন নির্ভীক ও বেপরোয়া তরুণ প্রজন্ম কদাচিৎ প্রত্যক্ষ করিয়াছে। কথাটি কর্ণে প্রশংসার ন্যায় ধ্বনিত হইলেও, শাসকের নিকট ইহা স্পষ্ট বিদ্রোহের শামিল। কেননা আত্মবিশ্বাস হইতেই প্রশ্নের অঙ্কুরোদ্গম হয়, আর প্রশ্নের সর্বাপেক্ষা কদর্য স্বভাব হইল—সে রাজদণ্ড বা পদমর্যাদার তোয়াক্কা করে না।

ঠিক এই কারণেই রঙ্গমঞ্চে আরশোলার প্রবেশ। এতদিন যে ক্ষোভ কেবল চায়ের ঠেকে ‘এ দেশের কিছু হইবে না’ বলিয়া দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হইত, তাহা অকস্মাৎ রাজপথে আসিয়া আছড়াইয়া পড়িল। আত্মপ্রকাশ ঘটিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র।

নামকরণের মধ্যেই রহিয়াছে চরম বিদ্রূপ। আরশোলাকে যতই তাড়ান না কেন, সে আঁধার কাটিয়া পুনর্বার বাহির হইবে; এক টিকে নিকেশ করিলে সহসা দশ দিক হইতে আরও দশটি প্রকাশ পাইবে। নামটির ভিতর দিয়াই রাষ্ট্রের উদ্দেশে যেন এক ব্যঙ্গাত্মক সাবধানবাণী নিক্ষেপ করা হইয়াছে—আমাদিগকে আপনারা তাচ্ছিল্য করিতে পারেন, রাজশক্তি দিয়া চূর্ণ করিতে পারেন, পাদুকা হস্তে তাড়া করিতেও পারেন; কিন্তু আমাদের বংশ ধ্বংস হইবে, এমন নিশ্চয়তা নাই।

রাজনৈতিক দলগুলি যখন তাহাদের নামের সহিত ‘জনতা’, ‘জাতীয়’, ‘গণতান্ত্রিক’, ‘ইনসাফ’ ইত্যাদি গম্ভীর শব্দ জুড়িয়া দেশোদ্ধারের মিথ্যা প্রতিজ্ঞা প্রচার করে, ইহারা তখন স্বেচ্ছায় নিজেদের ‘আরশোলা’ বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। এই সংজ্ঞায় আত্মপরিহাস যেমন আছে, তেমনই আছে এক তীব্র প্রচ্ছন্ন স্পর্ধা—আমরা নয়নসুখকর নহি, কুলীন নহি, আপনাদের প্রমোদভবনের যোগ্যও নহি; কিন্তু আমরা বর্তমান। এবং এত সহজে আমাদিগকে মুছিয়া ফেলা যাইবে না।

ককরোচ জনতা পার্টির সংগঠকেরা একদা আম আদমি পার্টির সহিত যুক্ত ছিলেন; পরবর্তীকালে বৈদেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত হইয়াছেন। কেহ বা তথ্যের অধিকার আইন প্রয়োগ করিয়া বিচারব্যবস্থার নিভৃত অন্ধিসন্ধিও অনুসন্ধান করিয়া ফেলিয়াছেন। অতএব, ইহারা রাজপথে দুই বেলা বৃথা চিৎকার করিবে, তিন দিন সমাজমাধ্যমে প্রচার চালাইবে এবং চতুর্থ দিনে কোনও প্রতিষ্ঠিত দলের যুবশাখার পদ অথবা সান্ধ্যকালীন উপহার লইয়া শান্ত হইবে—এমন অতিপরিচিত ভারতীয় সমাধানের আশা আপাতত সুদূরপরাহত।

অনশন বা অবস্থান উঠিতে পারে, কিন্তু অন্তরের আরশোলা অপসৃত হয় নাই।

ইহাদের স্পর্ধা দেখুন—তাহারা যুগপৎ প্রধানমন্ত্রী ও বিচারব্যবস্থাকে এক বন্ধনীতে রাখিয়া প্রশ্নবানে জর্জরিত করিতেছে। দৃশ্যটি দেখিয়া বিরোধী শিবিরের আহ্লাদিত হইবার কথা ছিল। কিন্তু মহা বিপত্তি বাধিল তখনই, যখন দেখা গেল—আরশোলার দল বিরোধীদেরও এক ইঞ্চি জমি ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত নহে।

এই তিক্ত সত্যটি বিরোধী নেতাদের গলায় যেন কাঁটার ন্যায় বিঁধিতেছে। কারণ সনাতন ভারতীয় রাজনীতিতে বিরোধীদের একটি অঘোষিত প্রত্যাশা থাকে—যাহার মুখ হইতে সরকারের বিরুদ্ধে বাক্যস্ফুরণ হইবে, সে নিশ্চিত আমাদেরই লোক; তাহাকে অবিলম্বে পুষ্পস্তবকে বরণ করিয়া লও, তাহার মতাদর্শের বিচার নির্বাচনের পর হইবে।

আরশোলারা সেই দীর্ঘকালীন নিরাপদ বন্দোবস্তটিকেই চুরমার করিয়া দিয়াছে। তাহারা হয়তো এখনও শিষ্টাচার শেখে নাই যে, গণতন্ত্রে প্রশ্ন করিবারও একটি নিজস্ব পালাবদল থাকে। দলবিশেষ যখন মসনদে থাকিবে তখন বিরোধী পক্ষ প্রশ্ন তুলিবে, আবার কালের চক্রে বিরোধী ক্ষমতায় আসিলে পূর্বতন শাসক অনুযোগ করিবে। আর মধ্যিখানে দাঁড়াইয়া আমজনতার কার্য হইবে কেবল এই চাপানউতোর দর্শন করা এবং প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একবার গিয়া একটি নির্দিষ্ট বোতাম টিপিয়া আসা।

স্বয়ং প্রশ্ন করিতে যাওয়া পাঠ্যসূচির সম্পূর্ণ বহির্ভূত আচরণ। আরশোলারা সেই নিষিদ্ধ সীমানায় পদক্ষেপ করিয়াছে।

স্বভাবতই নির্বাচনী কারবারিদের ললাটে চিন্তার রেখা গাঢ় হইতেছে। ইহারা যদি পৃথক শক্তিতে পরিণত হয়, তবে সরকার-বিরোধী ভোটের হিসাব যে এলোমেলো হইয়া যাইবে! এত যত্ন করিয়া রচিত রাজনৈতিক যোগ-বিয়োগের অঙ্কে যদি এক নূতন সংখ্যার অনুপ্রবেশ ঘটে, তবে সমীকরণ মিলিবে কিরূপে?

আমাদের দেশে জনসেবার পূর্বে দলীয় পাটিগণিত আয়ত্ত করিতে হয়। সেখানে প্রয়োজনের নিরিখে দুইয়ে আর দুইয়ে কদাচিৎ চার হয়, কখনও বা জোটের স্বার্থে সাড়ে সাতও হইয়া দাঁড়ায়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় স্তরের শীর্ষ বিরোধী নেতা যে অনশনকারীদের পার্শ্বে বসাইয়া সংবাদ সম্মেলন করিলেন, তাঁহারাও কার্যত জোটসঙ্গী বামপন্থী ছাত্র সংগঠনেরই সদস্য ছিলেন।

অতএব, সকলেই নিজ নিজ লাভ-ক্ষতির হিসাব কষিতেছেন। আন্দোলনের তীব্রতা কতটা তাহা ভাবিয়া কাহারো নিদ্রাভঙ্গ হয় না, কিন্তু আন্দোলনের ফসলটি দিনান্তে কাহার গোলায় উঠিবে—মূল বিবেচনা সেখানেই। গণতন্ত্রে জনতার আর্তনাদ অত্যন্ত মূল্যবান, তবে নির্বাচনের পূর্বে তাহার বিনিময়মূল্য খানিক বৃদ্ধি পায় মাত্র।

শাসকপক্ষ আপাতত কিছুটা সংকুচিত হইয়াছে। এবং সেখানেই সম্ভবত তাহাদের সর্বাপেক্ষা গুরুতর ভুলটি হইয়া গিয়াছে। কেননা রাজশক্তি যখন পিছু হটিতে বাধ্য হয়, তখন প্রজাবর্গ একটি পরম বিপজ্জনক সত্য উপলব্ধি করিয়া ফেলে—

‘সরকারও পরাস্ত হইতে পারে।’

এই প্রতীতি একবার মস্তকে প্রবিষ্ট হইলে তাহা কোনো চাতুর্যপূর্ণ বক্তৃতায় মুছিয়া ফেলা অসম্ভব। কৃষক ভাবেন, ‘ওহারা অধিকার ছিনাইয়া লইতে পারিলে আমরা কেন পারিব না?’ ছাত্র ভাবে, ‘উহাদের কথা মানা হইলে আমাদের দাবি গ্রাহ্য হইবে না কেন?’ মধ্যবিত্ত ভাবে, ‘তবে কি এতদিন আমি কেবল সামাজিক মাধ্যমে নিষ্ফল ক্রোধ প্রকাশ করিয়াই ক্ষান্ত ছিলাম?’

ইহার পরই ঘনাইয়া আসে চরম সংকট।

পেট্রলে অতিরিক্ত ইথানল মিশ্রণের সরকারি সিদ্ধান্ত লইয়া শীর্ষ মন্ত্রীদের উপর আক্রমণ প্রত্যহ বৃদ্ধি পাইতেছে। বিভিন্ন রাজ্যে কৃষকেরা ফসলের উপযুক্ত সহায়ক মূল্যের দাবিতে পথ অবরোধ করিতেছেন। কোথাও বা বিদ্যালয়ে সামান্য পরিস্রুত পানীয় জল ও শৌচাগারের দাবিতে ছাত্রসমাজ শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করিয়া আরশোলাদের ভঙ্গিমায় হুঙ্কার দিতেছে।

ফলত, আরশোলা আজ আর কেবল একটি বিশেষ সংগঠনের নাম নহে; উহা একটি সংক্রামক ধারণায় পর্যবসিত হইয়াছে। আর ধারণার সর্বপ্রধান সংকট এই যে, তাহাকে কারারুদ্ধ করিতে চাহিলে দণ্ডবিধির কোন্ নির্দিষ্ট ধারায় বাঁধিবেন, তাহা স্বয়ং পুলিশ কমিশনারও স্থির করিতে পারেন না।

ইতিমধ্যেই বিশিষ্ট কৃষক নেতাদের সহিত এই দলীয় প্রতিনিধিদের আলোচনা সম্পন্ন হইয়াছে। সন্নিকটে যখন বৃহৎ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন, তখন কৃষক ও আরশোলা একই ময়দানে নামিলে কাহার দ্বারা কে ব্যবহৃত হইবে—এই সূক্ষ্ম তত্ত্বে দূরদর্শনের বক্তারা হয়তো গলা ফাটাইবেন।

পরিশেষে উভয় পক্ষই বিজয়োল্লাসে ঘোষণা করিবে, ‘জনগণ আমাদের পক্ষেই রহিয়াছে।’ দুর্ভাগ্যবশত, সেই জনগণের মতামত স্বকর্ণে শুনিবার প্রয়োজন কেহই অনুভব করিবেন না।

আমাদের রাজ্যেও এই দৃশ্যপটের ব্যতিক্রম ঘটিবে না। বিরোধী পক্ষ এই অসন্তোষের সুবিধা তুলিয়া নিজ পাত্র পূর্ণ করিতে চাহিবে, আর শাসকদল সেই পাত্র কাড়িয়া লইবার সর্বপ্রকার চেষ্টা চালাইবে। বিরোধী নেতা হউন বা তাঁহার বিরুদ্ধপক্ষ—আরশোলাটি যতক্ষণ প্রতিবেশীর গৃহে উপদ্রব সৃষ্টি করে, ততক্ষণ তাহাকে ‘জনতার জাগ্রত বিবেক’ বলিয়া আখ্যা দিতে কাহারও রসনায় বাধে না।

বিপদ ঘটে ঠিক তখনই, যখন সেই বিভ্রান্ত পতঙ্গটি নিজের রান্নাঘরের হাঁড়িতে আসিয়া মুখ দেয়। তখনই সেই গণজাগরণ নিমেষে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলিয়া চিহ্নিত হয়, ক্ষুব্ধ নাগরিকের গোপন দলীয় পরিচয় আবিষ্কৃত হইয়া পড়ে এবং বৈকালিক বিতর্কসভায় অভিজ্ঞ পণ্ডিতেরা বুঝাইতে বসেন—আরশোলাটি আসলে কোন্ শত্রুশিবিরের চক্রান্তে এই গৃহে প্রবেশ করিয়াছে।

ভারতীয় রাজনীতিতে এই গতিসূত্রটি মধ্যাকর্ষণের নিয়মের অপেক্ষাও অধিক অভ্রান্ত।

কিন্তু এই অসংগঠিত আরশোলাদের লইয়া মূল সমস্যা অন্যত্র। কোনও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে দমন করা তুলনামূলকভাবে সহজ। তাহার সভাপতি থাকেন, সম্পাদক থাকেন, দলীয় কার্যালয় থাকে। পুরাতন পুলিশি নথি থাকে, নূতন সন্ধির আশ্বাস থাকে। কাহাকে আহ্বান করিলে বিরোধ মিটিবে, কাহাকে পদ বা টিকিট দিলে মুখ বন্ধ হইবে, কাহার বিরুদ্ধে রাজকোষের তদন্তকারী সংস্থাকে লেলাইয়া দিলে বিস্মৃত স্মৃতিশক্তি ফিরিয়া আসিবে—রাষ্ট্র এই কৌশলে বহু যুগ ধরিয়া সিদ্ধহস্ত।

কিন্তু এক জন নিঃসঙ্গ, অসংগঠিত মানুষের ক্ষেত্রে শাসক কী করিবে? যে যুবকটি কোনও দলভুক্ত নহে, কোনও নেতার চরণে প্রণাম করিয়া আসে নাই, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের মনোনয়নপত্রও দাবি করিতেছে না—সে যদি হঠাৎ রাজপথে খাড়া হইয়া বলে, ‘আমার প্রদত্ত রাজস্বের হিসাব দিন’, তখন শাসকের শিরদাঁড়া দিয়া শীতল স্রোত বহিয়া যায়।

তাহাকে বিরোধী দলের লোক বলিলে সে সগর্বে জানায়, সে কোনো দল মানে না। তাহাকে দেশদ্রোহী বলিলে সে পকেট হইতে জাতীয় পতাকা মেলিয়া ধরে। তাহাকে শত্রুশিবিরের বেতনভোগী বলিলে সে তাহাদের বিরুদ্ধেও সমান তীব্রতায় তোপ দাগে। এই শ্রেণির নাগরিক শাসনযন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত অস্বস্তিকর। কেননা, ইহাদিগকে কোনো পরিচিত Category-র মধ্যে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা যায় না।

আর কোনো নির্দিষ্ট Category ব্যতিরেকে আধুনিক রাজনীতির কারবার চলিবে কী প্রকারে?

আমাদের রাজনীতি বহু বৎসর ধরিয়া একটি চমৎকার কলাকৌশল নির্মাণ করিয়াছে। জনসাধারণের ক্ষোভকে প্রথমে জাতিতে বিভক্ত করো, ধর্মে খণ্ডিত করো, সম্প্রদায়ে ভাগ করো। অতঃপর দক্ষিণে বা বামে ঠেলিয়া দিয়া প্রত্যেকের হস্তে একটি করিয়া দলীয় পতাকা গুঁজিয়া দাও। ব্যাস, কার্যসিদ্ধি।

তখন জনরোষ আর বিপ্লব থাকে না; তাহা নিছক ‘ভোটব্যাংক’-এ রূপান্তরিত হয়।

আরশোলারা যদি বাস্তবিকই এই কৃত্রিম কাঠামোর বাহিরে অবস্থান করিতে সমর্থ হয়, তবেই পেশাদার রাজনীতিকদের সমূহ সর্বনাশ। কারণ তখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু আর ‘আসন্ন নির্বাচনে কাহার জয় হইবে’ তাহাতে সীমাবদ্ধ থাকিবে না।

মূল প্রশ্নটি হইবে—‘সিংহাসনে যে-ই আরোহণ করুক না কেন, রাজকোষের হিসাব চাহিবে কে?’

ক্ষমতাসীন পক্ষ নিশ্চিতরূপেই এই প্রশ্নকে বিষবৎ জ্ঞান করিবে। আর বিরোধী পক্ষও যে ইহাকে পরম স্নেহে গ্রহণ করিবে, এমন নহে। কারণ আজকের বিরোধীই তো কল্যকার অধীশ্বর হইবার বাসনায় দিবারাত্র বিনিদ্র রজনী যাপন করিতেছে।

আজ অন্যের ঘরে আরশোলা দেখিয়া যাঁহারা সানন্দে করতালি দিতেছেন, কাল সেই একই বালাই যে নিজের সিংহাসন তছনছ করিবে না—তাহার নিশ্চয়তা কোথায়?

অতএব, শেষ পর্যন্ত সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে একটি মাত্র বিষয়েই হয়তো অঘোষিত সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে—

‘আরশোলাদের অস্তিত্ব থাকুক। তবে কেবল অপরের গৃহে।’

কিন্তু বিধিলিপি খণ্ডিবে কে?

আরশোলা যে কাহারও অলিখিত অনুশাসন মান্য করিবার জন্য জন্ম লয় নাই।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search