বিজ্ঞানীরা প্রথমবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক ভাইরাসের জিনোম তৈরি করেছেন, যা ল্যাবে কাজ করেছে এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াও মারতে পেরেছে। একই সাথে জন্ম নিয়েছে নতুন প্রশ্নও। আমরা কি ভয় পাব???? পড়ার জন্য স্ক্রল করুন নিচে...

এআই বানাল একদম নতুন এক ভাইরাস, আমাদের কি ভয় পাওয়া উচিত?

বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে এমন একটি ভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম তৈরি করেছেন, যা প্রকৃতিতে কখনও ছিল না। শুধু কাগজে-কলমে নকশা নয়, ল্যাবে বানিয়ে পরীক্ষা করেও দেখা গেছে— এআই-এর তৈরি এই ভাইরাসগুলো সত্যিকারের ভাইরাসের মতোই কাজ করছে, এমনকি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াকেও মেরে ফেলতে পারছে। খবরটি যতটা রোমাঞ্চকর, ঠিক ততটাই তুলেছে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন।

কী ঘটেছে

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকরা এভো (Evo) নামের একটি এআই মডেল ব্যবহার করে এই কাজ করেছেন। এভো অনেকটা চ্যাটজিপিটির মতোই একটি “ভাষার মডেল”— তবে পার্থক্য হলো, এটি মানুষের ভাষা নয়, শিখেছে জীবের ডিএনএ-র “ভাষা”। লাখো ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার জিনগত কোড পড়ে পড়ে এভো শিখে নিয়েছে, কোন জিনগত সংকেত সাজালে একটি জীবাণু আসলে কাজ করবে।

গবেষকরা এভোকে দিয়েছিলেন একটি পরিচিত ব্যাকটেরিওফায (bacteriophage)— অর্থাৎ যে ভাইরাস মানুষ নয়, শুধু ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে— তার নমুনা। এই ফায-এর নাম ফাই-এক্স-১৭৪ (ΦX174), যা সাধারণত ই. কোলাই (E. coli) নামের ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে। এই নমুনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এআই মডেলটি প্রায় সাত লাখ নতুন জিনোম-নকশা তৈরি করে। তার মধ্য থেকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ২৮৫টি নকশা বেছে নিয়ে গবেষকরা সেগুলোর ডিএনএ ল্যাবে সংশ্লেষণ (সিন্থেসাইজ) করেন এবং ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ভেতর প্রবেশ করান।

ফলাফল— ১৬টি নকশা সত্যিই কাজ করেছে। এই কৃত্রিম ভাইরাসগুলো ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে ঢুকে নিজেদের কপি তৈরি করেছে এবং ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলেছে, কিছু ক্ষেত্রে তো আসল প্রাকৃতিক ভাইরাসের চেয়েও কার্যকরভাবে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয়, এগুলোর কয়েকটি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ই. কোলাই স্ট্রেনকেও ধ্বংস করতে পেরেছে।

কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া এখন স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম বড় মাথাব্যথা। এমন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সাধারণ ওষুধ কাজ করে না। এই ব্যাকটেরিওফায-নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতিকে বলা হয় “ফায থেরাপি”— যেখানে ভাইরাস দিয়েই ব্যাকটেরিয়া মারা হয়। সমস্যা হলো, প্রকৃতিতে সঠিক ফায খুঁজে পাওয়া সময়সাপেক্ষ। গবেষকদের আশা, এআই দিয়ে চাহিদামতো ফায “ডিজাইন” করা গেলে ভবিষ্যতে রোগী-নির্দিষ্ট চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে— এমনকি একসঙ্গে একাধিক আলাদা ফায ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়াকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগও কমানো যেতে পারে।

তাহলে ভয়ের কারণ কোথায়

এই আবিষ্কারের ইতিবাচক দিক থাকলেও, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির গবেষক টমাস ইঙ্গলসবি ও মরিৎস হানকে বলছেন, এআই দিয়ে ভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম বানানোর সক্ষমতা এখন বাস্তব— কিন্তু এটি নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মকানুন এখনও তৈরি হয়নি।

গবেষকরা অবশ্য সতর্কতা নিয়েছিলেন— এভো মডেলকে মানুষ বা প্রাণী সংক্রমণ করতে পারে এমন ভাইরাসের তথ্য শেখানো হয়নি, এবং এই ফায শুধু ব্যাকটেরিয়াতেই সীমাবদ্ধ, মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন— এই ধরনের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়া কতটা কঠিন। কারণ, কেউ চাইলে এই মুক্তভাবে ব্যবহারযোগ্য মডেলকে বিপজ্জনক জীবাণুর তথ্য দিয়ে নতুন করে প্রশিক্ষণ (ফাইন-টিউন) দিতে পারে। ঠিক এই আশঙ্কা থেকেই বিশেষজ্ঞরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH)-এর মতো সংস্থাগুলোর কাছে দ্রুত নজরদারি ও নীতিমালা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন।

শেষ কথা

তাহলে বিবিসি নিউজের প্রশ্নটার উত্তর কী— আমাদের কি সত্যিই ভয় পাওয়া উচিত? আপাতত তৈরি হওয়া ভাইরাসগুলো শুধু ব্যাকটেরিয়ার জন্যই বিপজ্জনক, মানুষের জন্য নয়। তাই এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু প্রযুক্তিটি যেভাবে দ্রুত এগোচ্ছে, তাতে বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকরা একমত— সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিটাও এখনই গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন রোগ সারানোর নতুন পথ দেখাতে পারে, তেমনি সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সেই একই প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে ঝুঁকিরও কারণ।


সূত্র: বিবিসি নিউজ (BBC News), সিএনএন, সায়েন্টিফিক আমেরিকান ও এবিসি নিউজ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেদন অবলম্বনে।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search