মরুভূমির বালির নীচে চাপা পড়ে থাকা হারানো শহরের সন্ধান দিল দেড় হাজার বছরের পুরনো এক রহস্যময় মানচিত্র। মোবাইলে পড়ার জন্য স্ক্রল করুন একটু নিচে ...

১৫০০ বছরের পুরনো মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া হারানো শহর

জর্ডনের মরুভূমিতে দিনের বেলায় দাঁড়ালে মনে হয়, পৃথিবীর এই অংশে যেন কোনও দিন জীবন ছিলই না। চার দিকে শুধু বালি, পাথর আর শুকনো হাওয়া। দূরে মৃত সাগরের দিক থেকে গরম বাতাস এসে বালিকে আরও অনুর্বর করে তোলে। অথচ এই নিষ্প্রাণ মাটির নীচেই নাকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ঘুমিয়ে ছিল একটি শহর— যেখানে এক সময় প্রার্থনার ঘণ্টা বাজত, জলচক্র ঘুরত, জলপাই পেষাই হত, চাষের জমিতে কাজ করত মানুষ।

আর সেই হারিয়ে যাওয়া শহরের পথ দেখাল কোনও আধুনিক প্রযুক্তি নয়, দেড় হাজার বছরের পুরনো একটি মানচিত্র।

নাম তার ‘মাদাবা ম্যাপ’। জর্ডনের মাদাবা শহরের সেন্ট জর্জ গির্জার মেঝেতে বসানো এই মোজাইক মানচিত্র তৈরি হয়েছিল বাইজান্টাইন যুগে, সম্ভবত খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে, সম্রাট জাস্টিনিয়ানের আমলে। ছোট ছোট রঙিন পাথর দিয়ে তৈরি সেই মানচিত্রে আঁকা ছিল নদী, পাহাড়, মরুভূমি, রাস্তা, শহর, গির্জা— গোটা ‘হোলি ল্যান্ড’-এর এক বিস্ময়কর ছবি। গবেষকদের মতে, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন টিকে থাকা ভূগোলভিত্তিক মোজাইক মানচিত্রগুলির অন্যতম।

এক সময় এই মানচিত্রে প্রায় ১৫০টিরও বেশি শহর ও গ্রামের নাম লেখা ছিল গ্রিক ভাষায়। জেরুজালেমকে সেখানে এত বিস্তারিত ভাবে দেখানো হয়েছে যে, ইতিহাসবিদেরা আজও সেই অংশ নিয়ে আলাদা গবেষণা করেন। মানচিত্রে দেখা যায় শহরের প্রবেশদ্বার, প্রধান রাস্তা, গির্জার অবস্থান, এমনকি কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিন্যাসও। আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার সঙ্গে এই চিত্রের বহু মিল পাওয়া গিয়েছে।

মাদাবা ম্যাপের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, এটি শুধু ধর্মীয় তীর্থস্থানের তালিকা নয়। বরং এটি ছিল এক ধরনের ‘ভিজ্যুয়াল গাইড’, যা সেই সময়ের তীর্থযাত্রীদের পথ দেখাতে ব্যবহার করা হত বলে মনে করা হয়। মৃত সাগর (Dead Sea), জর্ডন নদী, বেথলেহেম, জেরিকো— সবই সেখানে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে আঁকা হয়েছিল।

তবে সময়ের আঘাতে মানচিত্রটির অনেক অংশ নষ্ট হয়ে যায়। ভূমিকম্প, যুদ্ধ এবং গির্জার সংস্কারের সময় তার বিস্তীর্ণ অংশ হারিয়ে যায়। উনিশ শতকের শেষ দিকে নতুন করে গির্জা সংস্কারের সময় শ্রমিকদের চোখে প্রথম ধরা পড়ে এই মোজাইক। তারপর থেকেই ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মতত্ত্ববিদদের কাছে এটি এক অমূল্য সম্পদ হয়ে ওঠে।

ইতিহাসবিদেরা বহু দিন ধরেই জানতেন, এই মানচিত্র শুধু শিল্পকর্ম নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বহু হারানো জায়গার ইঙ্গিত। আর সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত গবেষকদের পৌঁছে দিল মরুভূমির নীচে চাপা পড়ে থাকা এক বিস্মৃত শহরের কাছে।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search