ইরানের পরমাণু ভাণ্ডারের দখল নিয়ে আমেরিকা-রাশিয়ার টানাপড়েন, আর তার মাঝখানে বিস্ফোরণের কিনারায় দাঁড়িয়ে পশ্চিম এশিয়া। মোবাইলে পড়ার জন্য স্ক্রল করুন একটু নিচে ...

আসল প্রশ্ন ইউরেনিয়াম

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলির দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— ইরান প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনের আত্মবিশ্বাসের চেয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাবটিই এখন বেশি চোখে পড়ছে। আঘাত হানা যায়, বিমান হামলা চালানো যায়, কড়া ভাষণে প্রতিপক্ষকে হুমকিও দেওয়া যায়। কিন্তু তার পর? ইরানের পারমাণবিক সঙ্কটের আসল গিঁট কোথায়?

প্রশ্নটা আসলে নাতান্‌জ বা ফোরদোর মতো কোনও একক পারমাণবিক পরিকাঠামো নয়। প্রশ্নটা আরও গভীরে। সেই প্রায় এনরিচড (সমৃদ্ধ) ইউরেনিয়ামের মজুত— যেটি এখনও পূর্ণমাত্রার অস্ত্রোপযোগী না হলেও তার খুব কাছাকাছি অবস্থায় হয়ত আছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ইরানের হাতে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। সেই মজুত যদি আরও পরিশোধিত হয়, তা হলে প্রায় দশটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপাদান পাওয়া সম্ভব। ফলে যুদ্ধের প্রশ্ন এখন আর কেবল কোনও পারমাণবিক পরিকাঠামো ধ্বংস করা নয়— প্রশ্ন হল সেই মজুত পদার্থের ভবিষ্যৎ কী।

এই জায়গাতেই হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাশিয়া। মস্কো ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, চাইলে তারা ইরানের এই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের হেফাজতে নিয়ে তাকে বেসামরিক জ্বালানিতে রূপান্তর করতে পারে। ভ্লাদিমির পুতিনের বক্তব্য ছিল— আমেরিকা যদি স্থলসেনা নামানোর ঝুঁকি না নিতে চায়, তবে ইউরেনিয়ামের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব রাশিয়া নিতে প্রস্তুত। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাস বলছে, অনেক সময় যে প্রস্তাব প্রথমে প্রত্যাখ্যাত হয়, পরে সেই প্রস্তাবই আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

আসলে ইরানের পারমাণবিক বোমার গল্প আজকের নয়। এর শিকড় ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার। ১৯৫৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার “Atoms for Peace” কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। নাম ছিল শান্তির উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি ভাগ করে নেওয়া। বাস্তবে এর ভিতরে ছিল অন্য এক ভূরাজনৈতিক হিসেব— এমন এক প্রযুক্তিগত নির্ভরতার বলয় তৈরি করা যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলি সোভিয়েত প্রভাববলয়ে না সরে যায়।

ইরান সেই কর্মসূচির অন্যতম অংশীদার ছিল। গবেষণা রিঅ্যাক্টর, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক সহায়তা— সব মিলিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রথম ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল আমেরিকাই। ইতিহাসের এক অদ্ভুত ব্যঙ্গ এখানেই— আজ যে রাষ্ট্রকে আমেরিকা থামাতে চাইছে, তার পারমাণবিক অভিযাত্রার প্রথম ধাপ একদিন শুরু হয়েছিল ওয়াশিংটনের সহায়তায়।

তারপর আসে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব। শাহের পতন, খোমেনির উত্থান, এবং তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নাটকীয় অবসান। কিন্তু বিপ্লব মানেই প্রযুক্তিগত স্মৃতি মুছে যাওয়া নয়। যে বিজ্ঞানীরা প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, যে গবেষণা অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল— সেগুলো রয়ে গেল। নতুন রাষ্ট্র সেই উত্তরাধিকারকেই নিজের কৌশলগত পরিকল্পনার মধ্যে টেনে নেয়।

১৯৮০ থেকে ১৯৮৮— আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধ সেই ভাবনাকে আরও শক্ত করে দেয়। সাদ্দাম হুসেনের ইরাককে পশ্চিমা সমর্থন, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ— সব মিলিয়ে তেহরানের কৌশলবিদরা বুঝতে শুরু করেন যে শুধু প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে টিকে থাকা যাবে না। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। সেই প্রতিরোধের এক দিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, অন্য দিক পারমাণবিক সক্ষমতার সম্ভাবনা।

নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার একক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক সেই সময় থেকেই ইরানের কৌশল আরও স্পষ্ট হতে থাকে— এক দিকে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া, অন্য দিকে প্রয়োজন হলে দ্রুত সামরিক সক্ষমতায় পৌঁছনোর পথ খোলা রাখা।

এর পরের অধ্যায় প্রযুক্তির। দু’হাজারের দশকের শেষ দিকে ইরানের সেন্ট্রিফিউজ কর্মসূচিতে বারবার অদ্ভুত সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। পরে জানা যায়, “স্টাক্সনেট” নামের এক জটিল সাইবার অস্ত্র ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করেছিল। বহু বিশ্লেষকের মতে এটি ছিল মার্কিন-ইজ়রায়েলি যৌথ অভিযানের ফল।

এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল— প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো ধ্বংস করা যায়, কিন্তু কৌশলগত সংকল্প ধ্বংস করা যায় না। সেন্ট্রিফিউজ ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা নতুন সেন্ট্রিফিউজ বানাতে শেখেন।

এই সঙ্কট থেকে বেরোবার চেষ্টা ছিল ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি— জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন। ওই চুক্তির শর্তে ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সীমিত রাখবে এবং আন্তর্জাতিক নজরদারি মেনে নেবে। অনেকের মতে চুক্তিটি নিখুঁত না হলেও কার্যকর ছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। তার পর থেকেই ইরান ধাপে ধাপে সমৃদ্ধকরণ বাড়াতে শুরু করে। আজ যে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে বিশ্ব উদ্বিগ্ন— তার পথে এই সিদ্ধান্তই বড় মোড় হয়ে দাঁড়ায়।

এই জায়গাতেই পুতিনের প্রস্তাব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ রাশিয়া বোঝাতে চাইছে— বিশ্বরাজনীতির এমন সঙ্কটময় মুহূর্তে তাকে বাদ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কিন্তু আগের জায়গাতেই ফিরে আসে। ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামো ধ্বংস করলেই কি সমস্যা মিটবে?

সম্ভবত না।

কারণ পরিকাঠামো ধ্বংস করা যায়। আবার তৈরি করা যায়। বিজ্ঞানীদের হত্যা করা যায়, কিন্তু জ্ঞানকে হত্যা করা যায় না। সেন্ট্রিফিউজ নষ্ট হয়, নতুন সেন্ট্রিফিউজ আসে।

কিন্তু যদি সেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অক্ষত থাকে— তা হলে সমস্যার মূলও অক্ষত থাকে।

তাই আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতির আসল প্রশ্ন কোনও বোমা হামলা নয়। প্রশ্নটা একটাই— সেই ইউরেনিয়াম কার হাতে থাকবে????

কারণ আধুনিক ভূরাজনীতিতে অনেক সময় যুদ্ধের আসল লক্ষ্য শহর নয়, অস্ত্রও নয়। লক্ষ্য থাকে পদার্থ।
আর সেই পদার্থের উপর নিয়ন্ত্রণই নির্ধারণ করে শক্তির ভবিষ্যৎ।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search