ডাল্টন স্কুলের সাধারণ শিক্ষক থেকে বিশ্বজোড়া ক্ষমতার অন্দরমহলে প্রবেশ— জেফ্রি এপস্টিনের উত্থান, রহস্য, প্রভাব আর অন্ধকার সাম্রাজ্যের গল্প। পড়ার জন্য স্ক্রল করুন একটু নিচে...

এপস্টিন এবং তারপর

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়।

নিউ ইয়র্কের নামী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ডাল্টন স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন এক তরুণ ইহুদি। নাম জেফ্রি এপস্টিন। সেই সাধারণ স্কুলশিক্ষক কী ভাবে কয়েক দশকের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক আর্থিক পরামর্শদাতা হয়ে উঠলেন, এবং কী ভাবে বিশ্বের ক্ষমতাশালী মানুষদের নিজের ব্যক্তিগত দ্বীপে টেনে এনে এক ভয়ঙ্কর যৌনচক্র গড়ে তুললেন— সেই কাহিনি এখনও বিস্ময়ের। বিস্ময় এই কারণে নয় যে, সমাজে হঠাৎ উত্থানের গল্প আমরা শুনিনি। বিস্ময় এই কারণে যে, এপস্টিনের প্রকৃত পুঁজি ছিল মূলত একটাই— প্রভাবশালীদের সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার অদ্ভুত দক্ষতা। এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক ঘিরে অনেকের মনেই তাই প্রশ্ন জাগছে— পৃথিবীর এত ক্ষমতাশালী মানুষের সঙ্গে এই ব্যক্তির এমন নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠল কী করে? সেই উত্তর খুঁজতে গেলে তাঁর জীবনের শুরুর দিকে তাকাতে হয়।

ব্রুকলিনের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম এপস্টিনের। পড়াশোনায় তিনি মন্দ ছিলেন না। কলেজেও ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জন করেননি— অন্তত তার প্রমাণ মেলে না। তবু তাঁর আচরণ এমন ছিল যে, মানুষ তাঁকে সহজেই উচ্চশিক্ষিত বলে ধরে নিত। আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব— এই দুয়ের জোরেই সম্ভবত তিনি প্রথম সুযোগটি পান। সেই সুযোগ ডাল্টন স্কুলে। ম্যানহাটনের সেই অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনও ডিগ্রি ছাড়াই একজন অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক নিযুক্ত হচ্ছেন— ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক। কিন্তু সেটাই ঘটেছিল। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ছিলেন ডোনাল্ড বার— জন্মসূত্রে ইহুদি, পরে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরই সিদ্ধান্তে এপস্টিন নিয়োগ পান। বার মনে করেছিলেন, তরুণটি অত্যন্ত মেধাবী। এপস্টিন তাঁর কাছে কী ভাবে পৌঁছেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু বোঝা যায়— তিনি দ্রুতই বার-এর আস্থা অর্জন করেছিলেন।

এই চাকরি অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। ১৯৭৬ সালে ডাল্টন স্কুল থেকে এপস্টিনকে বিদায় নিতে হয়। পড়ানো নিয়ে আপত্তি ওঠেনি। আপত্তি উঠেছিল তাঁর আচরণ নিয়ে। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শিক্ষকের স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করছে— এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল কর্তৃপক্ষের মধ্যে। পরে যে অভিযোগগুলি এপস্টিনকে ঘিরে সামনে আসে, তার আভাস যেন এখানেই ছিল। সরাসরি নিগ্রহের অভিযোগ তখন ওঠেনি। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তাঁর অতিরিক্ত কৌতূহল, অস্বস্তিকর প্রশ্ন, কখনও দীর্ঘ সময় ধরে আলাদা করে কথা বলা— এসব আচরণ স্কুল কর্তৃপক্ষকে উদ্বিগ্ন করেছিল। তাই তাঁকে বিদায় দেওয়া হয়।

তবে এই বিদায় এপস্টিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি। কারণ এর মধ্যেই তিনি আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা আয়ত্ত করে ফেলেছেন— প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। ডাল্টনের ছাত্রছাত্রীরা ছিল ধনী পরিবারের সন্তান। তাদেরই এক অভিভাবকের সূত্রে এপস্টিন চাকরি পেয়ে গেলেন ওয়াল স্ট্রিটের নামী ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক বেয়ার স্টার্নসে।

সত্তরের দশকে বেয়ার স্টার্নস ছিল আর্থিক জগতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার সময় সংস্থাটি ভেঙে যায়, কিন্তু তার বহু আগে থেকেই ওয়াল স্ট্রিটে এর যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল। এখানে চাকরি পাওয়ার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা প্রয়োজন, তার অনেকটাই এপস্টিনের ছিল না। কিন্তু সুপারিশ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের জোরে তিনি সেখানে ঢুকে পড়েন। এবং অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বিস্ময়কর উন্নতি ঘটান। জুনিয়র পদ থেকে উঠে সংস্থার লিমিটেড অংশীদার হয়ে ওঠেন মাত্র চার বছরের মধ্যে।

এই সময়েই এপস্টিন শিখে ফেলেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল— ধনীদের করের বোঝা কমানোর উপায় বাতলে দেওয়া, বিকল্প বিনিয়োগের পথ দেখানো, এবং সবচেয়ে বড় কথা— ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা। দ্রুতই তিনি বুঝে ফেলেছিলেন, সমাজের উচ্চস্তরে কাগুজে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়, সুপারিশ আর যোগাযোগ অনেক বেশি কার্যকর। আজকের দিনে যেমন অনেকে সেলিব্রিটিদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে ভালবাসেন, এপস্টিন সেই প্রবণতার বহু আগেই প্রভাবশালীদের সঙ্গে ছবি তুলে নিজের সামাজিক মূলধন বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করতেন।

বেয়ার স্টার্নসের সময়টা তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত তৈরি করে দেয়। পাশাপাশি তৈরি হয় বিস্তৃত যোগাযোগের জাল। ফলে ১৯৮৮ সালে যখন তিনি নিজের সংস্থা— জে. এপস্টিন অ্যান্ড কোম্পানি— প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর পক্ষে ধনী মক্কেল জোগাড় করা আর কঠিন ছিল না। এই সংস্থা সাধারণ ধনী নয়— শুধু বিলিয়নিয়ার ক্লায়েন্ট নিত।

তেমনই এক ক্লায়েন্ট ছিলেন লেসলি ওয়েক্সনার। এল ব্র্যান্ডস সাম্রাজ্যের কর্ণধার— যার অধীনে ছিল ভিক্টোরিয়া’জ় সিক্রেট, বাথ অ্যান্ড বডি ওয়র্কস, লা সেনজ়া প্রভৃতি ব্র্যান্ড। ওয়েক্সনার এপস্টিনের উপর এতটাই ভরসা করতেন যে, নিজের সম্পত্তি, বিমান, এমনকি আর্থিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তাঁকে বড় ভূমিকা দিতেন। এই সম্পর্ক এপস্টিনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এর কিছুদিন পর তাঁর জীবনে আসেন গিজ়লেন ম্যাক্সওয়েল। ব্রিটিশ সোশ্যালাইট। সময়টা নব্বই দশকের শুরু। গিজ়লেনের বাবা রবার্ট ম্যাক্সওয়েল ছিলেন ব্রিটেনের প্রভাবশালী প্রকাশনা ব্যবসায়ী। পারগামন প্রেস এক সময় তাঁরই মালিকানায় বিপুল সাফল্য পায়। পরে তিনি মিরর সংবাদপত্র গোষ্ঠী এবং ম্যাকমিলান প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত হন। জীবনের শেষ দিকে অবশ্য তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ১৯৯১ সালে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

গিজ়লেন বাবার সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর বিস্তৃত সামাজিক যোগাযোগও ছিল। রাজনীতি, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসা— বহু ক্ষেত্রেই পরিচিতি। নিউ ইয়র্কে এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হওয়ার পর এই যোগাযোগ দু’জনেরই কাজে লাগে। তাঁদের সম্পর্ক কতটা ব্যক্তিগত, কতটা ব্যবসায়িক— তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পারস্পরিক স্বার্থ যে তাদের একত্রে বেঁধেছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

এর পরের ঘটনাপ্রবাহ আরও অদ্ভুত। এপস্টিন ও গিজ়লেন চাইলে আরামদায়ক জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তার বদলে তাঁরা তৈরি করলেন এক বিস্তৃত যৌনচক্র, যার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল নাবালিকারা। কেন এই পথে হাঁটলেন তাঁরা? এপস্টিনের ক্ষেত্রে তাঁর বিকৃত যৌনরুচির কথা বলা হয়। ডাল্টন স্কুলের ঘটনাও সেই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু গিজ়লেন কেন এতে সক্রিয় ভূমিকা নিলেন— সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট।

আরও একটি রহস্য রয়েছে। এপস্টিন একা এই কুকীর্তি চালাননি। ধীরে ধীরে তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে জড়ো হতে শুরু করেন বিশ্বের বহু ক্ষমতাশালী ব্যক্তি— রাজনীতি, ব্যবসা, বিনোদন, এমনকি শিক্ষা জগতের মানুষও। প্রশ্ন হল— তিনি কেন এত লোককে এতে জড়ালেন? কেন তাঁদের উপস্থিতির রেকর্ড রাখলেন?

সম্ভবত এখানেই এপস্টিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কাজে লাগিয়েছিলেন। অর্থাৎ যোগাযোগই শক্তি। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যদি একই গোপন অপরাধে জড়িয়ে ফেলা যায়, তবে তারা নিজেদের রক্ষার স্বার্থেই নীরব থাকবে। এপস্টিনের ক্ষেত্রেও যেন সেই অঙ্কটাই কাজ করেছিল। ২০০৮ সালে তথাকথিত ‘সুইটহার্ট ডিল’-এর মাধ্যমে তুলনামূলক লঘু শাস্তি পেয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আসতে পারা— সেই জালের শক্তিরই ইঙ্গিত দেয়।

এই চক্রে মেয়েদেরও একইভাবে ব্যবহার করা হত। টাকার লোভ দেখিয়ে বলা হত— আরও মেয়েকে নিয়ে এসো। ফলে নতুন শিকার যেমন জুটত, তেমনই মেয়েদের নিজেদেরও চক্রের অংশ করে তোলা যেত। প্রতিবাদ বা অভিযোগ করার সম্ভাবনাও তখন কমে যেত।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়— এপস্টিন ও গিজ়লেন দু’জনেই ইহুদি। বহু প্রভাবশালী ইহুদি ব্যক্তির সঙ্গেও তাঁদের যোগাযোগ ছিল। ডোনাল্ড বার, লেসলি ওয়েক্সনার— এই তালিকায় আরও নাম যোগ করা যায়। গিজ়লেনের বাবা রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে ইজ়রায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সম্পর্কের কথাও বহুবার আলোচনায় এসেছে। ফলে এ প্রশ্নও উঠেছে— এত লোকের গোপন তথ্য সংগ্রহ করা কি কেবল ব্যক্তিগত বিকৃতির ফল, না কি এর পিছনে আরও বড় কোনও পরিকল্পনা ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। সম্ভবত তার কিছু সূত্র রয়েছে গিজ়লেন ম্যাক্সওয়েলের কাছেই।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search