লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর স্বপ্ন আজ প্রশ্নফাঁসের অন্ধকারে বন্দি। শিক্ষাব্যবস্থা পরিণত হয়েছে অর্থ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার নির্মম বাজারে। দর্শক কি বলছেন মোবাইলে পড়ার জন্য স্ক্রল করুন একটু নিচে...

নট এ নীট পরীক্ষা

আজকের ভারতবর্ষে শিক্ষা আর বিদ্যার তপোবন নহে; ইহা এক বহুমূল্য পণ্য, এক নির্মম বাণিজ্যিক পরিকাঠামো, যেখানে ছাত্রছাত্রীর স্বপ্নকে নিলামে তোলা হয়, অভিভাবকের উদ্বেগকে মূলধনে রূপান্তরিত করা হয়, এবং জাতির ভবিষ্যৎকে কয়েকটি দুর্বৃত্তচক্রের হাতে সমর্পণ করা হয়। নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নফাঁস-কাণ্ড সেই ভয়ঙ্কর সত্যটিকেই পুনরায় নগ্ন করিয়া তুলিল। যে পরীক্ষাকে কেন্দ্র করিয়া লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী জীবনের বহু মূল্যবান বৎসর উৎসর্গ করে, যে পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের চিকিৎসক সমাজের নির্মাণ, সেই পরীক্ষাই আজ পরিণত হইয়াছে এক সুসংগঠিত কালোবাজারি চক্রের খেলাঘরে।

প্রকাশিত তথ্য বলিতেছে, প্রশ্নফাঁসের এই চক্র কোনও বিচ্ছিন্ন অপরাধ নহে; ইহা এক সুপরিকল্পিত “পিরামিড অর্থনীতি”। উপরে রহিয়াছে তথাকথিত ‘সলভার গ্যাং’-এর মাথারা, যাহাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ প্রশ্নপত্রের ছাপাখানা হইতে পরিবহণব্যবস্থা পর্যন্ত বিস্তৃত। তাহাদের নীচে ‘কিংপিন’, তাহাদের নীচে দালাল, তাহাদের নীচে ‘সলভার’, এবং সর্বশেষ স্তরে তথাকথিত ‘ডেলিভারি এজেন্ট’। প্রশ্নপত্র বিক্রিরও আবার ‘পাইকারি’ ও ‘খুচরো’ বাজার! যেন শিক্ষা নহে, কোনও মাদকচক্রের বিপণনব্যবস্থা! তদন্তকারীদের অনুমান, এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় লেনদেনের পরিমাণ ১০০ কোটিরও অধিক। পরীক্ষার্থীপিছু ১৫ হইতে ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হইয়াছে। এমনকি পরীক্ষার আগের রাত্রিতেও টেলিগ্রামের মাধ্যমে ২৫-৫০ হাজার টাকায় প্রশ্ন বিক্রির অভিযোগ উঠিয়াছে।

এই চিত্র কেবল দুর্নীতির নহে; ইহা সামাজিক বৈষম্যের নগ্ন প্রতিচ্ছবি। যাহার অর্থ আছে, সে প্রশ্ন কিনিবে; যাহার অর্থ নাই, সে সারারাত্রি জেগে বই মুখস্থ করিবে। ধনী পরিবারের সন্তান প্রশ্নপত্রের বিনিময়ে ‘নিশ্চিত ভবিষ্যৎ’ ক্রয় করিবে, আর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছাত্রটি কেবল মানসিক অবসাদ, অনিশ্চয়তা ও আত্মসম্মানের ক্ষরণ লইয়া বাড়ি ফিরিবে। শিক্ষা কি তবে আজ আর মানবিক উন্নতির সোপান নহে? ইহা কি কেবল অর্থশক্তির অলিন্দে প্রবেশের টিকিট?

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়, এই বিপর্যয় কোনও আকস্মিক প্রশাসনিক বিচ্যুতি নহে। ২০২৪ সালেও নিট-পিজি পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বাতিল বা স্থগিত হইয়াছিল। তাহার পরেও জাতীয় পরীক্ষাব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করিবার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছিল, তাহা আজ ভস্মীভূত। প্রশ্ন উঠিবেই— ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) আদৌ কি পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে সক্ষম? নাকি ইহা এক সম্পূর্ণ জীর্ণ, অদক্ষ ও দায়হীন প্রতিষ্ঠান, যাহারা কেবল পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করিতে জানে, কিন্তু পরীক্ষার সততা রক্ষা করিতে জানে না?

২৩ লক্ষেরও অধিক ছাত্রছাত্রী এই পরীক্ষার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। ইহাদের বহুজন গ্রামাঞ্চল হইতে আসে, বহু পরিবার জমি বিক্রি করিয়া, ঋণ লইয়া, কোচিং সেন্টারের বিপুল ফি প্রদান করিয়া সন্তানকে প্রস্তুত করে। কেহ কেহ এক বৎসর, কেহ দুই বৎসর, কেহ বা তিন বৎসর ‘ড্রপ’ দেয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাহাদের হাতে ফিরিয়া আসে কী? বাতিল পরীক্ষা, পুনরায় অনিশ্চয়তা, এবং প্রশাসনের শীতল বিবৃতি।

ইহা কেবল একটি পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা নহে; ইহা রাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয়। যে দেশে শিক্ষা দুর্নীতির বাজারে পরিণত হয়, যে দেশে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ক্রিপ্টোকারেন্সির আড়ালে কেনাবেচা হয়, যে দেশে মেধার উপর অর্থের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়— সেই দেশ ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যৎকেই হত্যা করে। কারণ, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে কেবল কয়েকটি আসন চুরি হয় না; চুরি হয় একটি প্রজন্মের আস্থা।

আজ ভারতের ছাত্রসমাজ কেবল ক্লান্ত নহে; তাহারা প্রতারিত। তাহাদের চোখে আর কেবল পরীক্ষার ভয় নাই; রহিয়াছে ব্যবস্থার প্রতি গভীর অবিশ্বাস। আর সেই অবিশ্বাসের দায় এড়াইবার কোনও নৈতিক অধিকার NTA কিংবা শাসকশ্রেণির নাই। শিক্ষাকে যেদিন বাজারের পণ্যে পরিণত করা হইল, সেদিনই এই বিপর্যয়ের বীজ রোপিত হইয়াছিল। আজ তাহারই বিষবৃক্ষ সমগ্র জাতিকে আচ্ছন্ন করিতেছে।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search