নেপালের বিপর্যয়ের কারন

নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান নিয়ে জল্পনা যখন তুঙ্গে, তখন প্রশ্ন উঠছে— আদতে কেন ঘটল এই বিপর্যয়? বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। শুধু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নয়, মানুষের হাতে তৈরি ভুলও কম দায়ী নয় বলে মত পরিবেশবিদদের একাংশের। আর সেই তালিকায় বারবার উঠে আসছে চিনের উজানে বাঁধ নির্মাণ এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ।

হিমালয়ের উষ্ণতা বৃদ্ধিই মূল কারণ

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাংটাং জাতীয় উদ্যান এলাকায় একটি হিমবাহের আকস্মিক ধসেই সূত্রপাত এই দুর্যোগের। বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চল বিশ্বের গড় হারের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। ফলে হিমবাহ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, বরফের নীচে জমে থাকা জলের চাপ বাড়ছে এবং যে কোনও মুহূর্তে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ভূবিজ্ঞানী ইয়াকব স্টাইনারের কথায়, “এই ধরনের বিপর্যয় এখন থেকে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই যাবে।”

চিনের বাঁধ ও তথ্য-গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন

তবে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখতে নারাজ পরিবেশবিদদের একাংশ। তিব্বতের অধিকারকর্মীরা ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন চিনের বিরুদ্ধে। তাঁদের অভিযোগ, তিব্বতের কিয়েরুং এলাকায় ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বেজিং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করেনি। তিব্বত পলিসি ইনস্টিটিউটের দোন্দুপ ওয়াংমোর কথায়, “চিন যদি দায় স্বীকার না করে, তা হলে এই ধরনের বিপর্যয় ফের ঘটতে পারে। এই ঘটনায় স্বচ্ছতার বিরাট অভাব রয়েছে।”

উদ্বেগ আরও বেড়েছে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে চিনের নির্মীয়মাণ বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ ঘিরে। আন্তর্জাতিক তিব্বত নেটওয়ার্কের পরিবেশ গবেষক লোবসাং ইয়াংৎসোর সতর্কবার্তা, নেপালের এই দুর্ঘটনা আসলে “ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা”। কারণ, অরুণাচল প্রদেশ ও অসম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্রের উৎসও তিব্বতেই। উজানে একতরফা ভাবে বাঁধ তৈরি এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করলে, অথচ নিম্ন অববাহিকার দেশগুলির সঙ্গে জল ও বিপর্যয়-সংক্রান্ত তথ্য ভাগ না করলে, ভবিষ্যতে ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশও একই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। যদিও চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের দাবি, “চিনের তথ্য প্রকাশ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, যার মাধ্যমে সময়মতো পরিস্থিতি জানা সম্ভব হয়েছে।”

এই প্রেক্ষিতে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট— বহু বছর ধরেই নয়াদিল্লি সীমান্ত পেরিয়ে আসা নদীগুলির উপরে চিনের একতরফা নির্মাণকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে, এবং তথ্য আদানপ্রদানের স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে বরাবর। নেপাল বিপর্যয়ের পরে অবশ্য ভারত দ্রুততার সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের পাশে দাঁড়িয়েছে— পাঠিয়েছে ৫৭ টনেরও বেশি ত্রাণসামগ্রী এবং উদ্ধারকারী দল। প্রতিবেশী সঙ্কটে ভারতের এই তৎপরতা এবং তথ্য-স্বচ্ছতার পক্ষে অবস্থান, চিনের নীরবতার সঙ্গে ক্রমেই তুলনীয় হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক মহলে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণও বাড়িয়েছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের নিজস্ব অপরিকল্পিত নগরায়ণও এই বিপর্যয়ের তীব্রতা বাড়িয়েছে। পরিবেশ-ইতিহাসবিদ টম রবার্টসনের ব্যাখ্যা, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের জেরে কাঠমান্ডু উপত্যকার জলাভূমি, টিলা এবং জলধারার মতো প্রাকৃতিক জলাধারগুলি হারিয়ে গিয়েছে। নদীর দু’পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে বসতি। জলবিশেষজ্ঞ মধুসার উপাধ্যায়ের কথায়, “নদীর গতিপথ সংকুচিত হলে জলের বেগ এবং শক্তি, দুই-ই বেড়ে যায়।” ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কাঠমান্ডুর নির্মিত এলাকা বেড়েছে প্রায় ৩৮৬ শতাংশ, অথচ কমেছে অরণ্যভূমি প্রায় ২৮ শতাংশ। নগর পরিকল্পনাবিদ কৃতি কুসুম জোশীর পর্যবেক্ষণ, জমির আকাল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নদীর তলদেশও এখন নির্মাণের লোভনীয় জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফল ভোগ করছেন সেখানে বসতি গড়া সাধারণ মানুষ।

উপসংহার

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা স্পষ্ট— জলবায়ু পরিবর্তন, উজানে একতরফা নির্মাণ ও তথ্য-অস্বচ্ছতা, এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ, এই তিন কারণের যোগফলেই তৈরি হয়েছে নেপালের এই ভয়াবহ বিপর্যয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি সতর্কবার্তা— বিশেষত ভারতের মতো দেশের জন্য, যার একাধিক প্রধান নদীর উৎস তিব্বতের হিমবাহে। তাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বচ্ছ জল-তথ্য আদানপ্রদান এবং যৌথ পূর্বাভাস ব্যবস্থার দাবি আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ।


সূত্র: ট্রিবিউন ইন্ডিয়া, এএনআই, ওয়ান লাইন খবর, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা (ইউএসজিএস) এবং অন্যান্য প্রতিবেদন অবলম্বনে।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search