হিমবাহ ধসে ভয়াবহ হড়পা বানে বিধ্বস্ত নেপাল। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৮০০ জনের, নিখোঁজ প্রায় তিন হাজার। জলবায়ু পরিবর্তনই কি দায়ী, উঠছে প্রশ্ন। পড়ার জন্য স্ক্রল করুন একটু নিচে...

নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: হিমবাহ ধসে ৮০০-র বেশি মৃত্যু, নিখোঁজ প্রায় তিন হাজার

হিমবাহ ধসে ভয়াবহ হড়পা বানের কবলে নেপাল। নেপাল-চিন সীমান্ত ঘেঁষা পাহাড়ি এলাকায় গত ২৬ অগস্ট আছড়ে পড়া এই দুর্যোগে এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৮০০ জনের। নিখোঁজ প্রায় তিন হাজার মানুষ। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে হিমালয়ের ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা— যার জেরে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে বলেই আশঙ্কা।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালের লাংটাং জাতীয় উদ্যান এলাকায় হঠাৎই ধসে পড়ে একটি পাহাড়ের ঢাল, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল হিমবাহের একটি অংশও। ওই ধসে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়েছিল, তা প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। এর পরেই বরফ এবং জল দ্রুত গলে গিয়ে কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপ-সহ প্রবল বেগে নেমে আসে লেন্দে খোলা এবং ত্রিশূলী খোলা নদীর গতিপথ ধরে, প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত। ঘণ্টা তিনেক পরে ফের একটি ছোট ধস নামে একই এলাকায়, যার শক্তি ছিল ৪.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান। উল্লেখ্য, একই পাহাড় থেকে ২০১৫ সালেও এমন ধস নেমেছিল বলে জানা গিয়েছে।

এই হড়পা বানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নুওয়াকোট জেলার একাধিক জনবসতি— দেবীঘাট, ত্রিশূলী বাজার এবং সংলগ্ন গ্রামগুলি। সীমান্তের ওপারে চিনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিয়ারং কাউন্টিও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বহু বাড়িঘর কাদাজলে তলিয়ে গিয়েছে। সেতু এবং রাস্তা ভেঙে পড়েছে বহু জায়গায়। কাদার তলায় সম্পূর্ণ চাপা পড়ে গিয়েছে একাধিক গাড়িও।

মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা

প্রশাসনিক সূত্রে খবর, নেপালে মৃতের সংখ্যা ৭৮৮, চিনের অংশে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের— সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৮০০। নিখোঁজের তালিকায় নেপালে রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার এবং চিনে প্রায় সাড়ে পাঁচশো জন। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার মানুষের এখনও হদিশ মেলেনি। ইতিমধ্যেই উদ্ধার করা হয়েছে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষকে। এই দুর্যোগে সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৯০ হাজার মানুষ।

নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন বিদেশি নাগরিকরাও। মার্কিন বিদেশ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় ৯০ জন মার্কিন নাগরিকের এখনও খোঁজ মেলেনি, যাঁদের মধ্যে ২২ জন ছিলেন কৈলাস পর্বত তীর্থযাত্রায় যাওয়া একটি দলের সদস্য। ট্রেকিং, তীর্থযাত্রা কিংবা কর্মসূত্রে নেপালে থাকা শতাধিক বিদেশি নাগরিক এই দুর্যোগের কবলে পড়েছেন বলেই জানা যাচ্ছে।

সুড়ঙ্গে আটকে শতাধিক শ্রমিক

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৩এ এবং ৩বি সুড়ঙ্গে এখনও আটকে রয়েছেন শতাধিক শ্রমিক। উদ্ধারকারীরা কাদার স্তর ভেঙে সুড়ঙ্গের ভিতরে বাতাস পাঠানোর কাজ শুরু করেছেন। আটকে পড়া এক শ্রমিকের পরিবারের এক সদস্যের কথায়, “ইতিমধ্যেই চার দিন হয়ে গিয়েছে। আমরা চাই, প্রশাসন যত দ্রুত সম্ভব ওকে উদ্ধার করুক।”

দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার জেরে যথেষ্ট কঠিন হয়ে উঠেছে উদ্ধারকাজ। নুওয়াকোট জেলা থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচশো বার হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে উদ্ধারের কাজে। ভারত এবং চিন থেকেও যোগ দিয়েছে বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে কাজে দক্ষ উদ্ধারকারী এবং এভারেস্ট অভিযানে অভ্যস্ত পর্বতারোহীরাও।

সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে একাধিক দেশ

নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানালের কথায়, এই মুহূর্তে সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার নিখোঁজদের খুঁজে বার করা। ইতিমধ্যেই ৩৬ লক্ষ ডলারের মানবিক সাহায্য ঘোষণা করেছে আমেরিকা, যার মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার পরিবারের জন্য তিন মাসের জরুরি খাদ্যসাহায্য। ভারতের তরফে পাঠানো হয়েছে ৫৭ টনেরও বেশি ত্রাণসামগ্রী। সাহায্য এসেছে চিন, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার তরফ থেকেও।

জলবায়ু পরিবর্তনের ইঙ্গিত

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুর্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চল বিশ্বের গড় হারের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে উষ্ণ হচ্ছে, যার জেরে হিমবাহ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ধসের আশঙ্কা বাড়ছে। ভূবিজ্ঞানী ইয়াকব স্টাইনারের সতর্কবার্তা, “কাল যা ঘটে গেল, দুর্ভাগ্যবশত সেটাই এখন থেকে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে। এখান থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই যাবে।”

নেপালের এই হড়পা বান ফের একবার মনে করিয়ে দিল, হিমালয়ের মতো ভঙ্গুর পরিবেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা তাৎক্ষণিক এবং প্রাণঘাতী হতে পারে। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে পুরোদমে, বহু পরিবার এখনও প্রিয়জনের প্রতীক্ষায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে না এলে হিমালয়ের কোলে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য আগামী দিনে এমন দুর্যোগ আরও বাড়তে পারে।


সূত্র: সিএনএন, সিবিএস নিউজ, এনপিআর এবং মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search