বিদ্যালয়ের প্রচলিত ধারণাটি দ্রুত বদলাচ্ছে। শিক্ষালাভ একদিকে খরচসাপেক্ষ আবার অন্যদিকে শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে আয়ের দিশা দেখানোর ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু বদল আসছে। জানার জন্য স্ক্রল করুণ নীচে . . .

আলফা হইবার শিক্ষা

বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা একটি পণ্য বিশেষ। সত্য বলিতে পণ্যটি ব্যয়বহুল। যাহার ব্যয়ভার বহন করিতে গিয়া সাধারণ অভিভাবকগণ দিশাহারা। প্রাথমিক হইতে মাধ্যমিক শিক্ষার গন্ডি পার হইতেই যেখানে বহুল মুদ্রা ব্যয়িত হয়, সেখানে উচ্চশিক্ষার কথা ভাবিলে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক। বিশেষ করিয়া শিক্ষা যেখানে শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে আয়ের দীশা দেখাইতে দ্বীধাগ্রস্ত। এই কঠিন সময়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ‘আলফা স্কুল’ নামক এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক অবিশ্বাস্য ও বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি লইয়া অবতীর্ণ হইয়াছে। তাহাদের ঘোষণা— স্নাতক হইবার পূর্বেই যদি কোনো শিক্ষার্থী এক মিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সোয়া নয় কোটি টাকা) উপার্জন করিতে অসমর্থ হয়, তবে তাহার সম্পূর্ণ টিউশন ফি বা শিক্ষণ-শুল্ক ফেরত দেওয়া হইবে।


কৃত্রিম মেধা বা এআই-চালিত এই বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতিও গতানুগতিক ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কৃত্রিম মেধার সহায়তায় ছাত্রছাত্রীরা সারাদিনের পাঠ্যসূচি মাত্র দুই ঘণ্টায় সম্পন্ন করিতে সক্ষম। চ্যাট-জিপিটি (ChatGPT) কিংবা ক্লড (Claude)-এর ন্যায় উন্নত প্রযুক্তি শিক্ষার্থীর মেধা ও পারদর্শিতা যাচাই করিয়া তাহাদের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষাপরিকল্পনা প্রস্তুত করে। দিনের অবশিষ্ট সময় ব্যয়িত হয় জীবনশৈলী শিক্ষা, সৃজনশীল প্রকল্প এবং সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীতে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাকেঞ্জি প্রাইসের মতে, এই পদ্ধতির ফলেই তাঁহাদের শিক্ষার্থীরা আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ২ শতাংশ মেধাবীর তালিকায় স্থান করিয়া লইয়াছে।


আলফা স্কুলের এই প্রকল্পের ঘোষিত মূল লক্ষ্য হইল কিশোর বয়সেই শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করিয়া তোলা। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ম্যাকেঞ্জি প্রাইস এবং ব্রায়ান হোল্টজ-এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই বিদ্যায়তনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিন নগরীতে ইহার প্রথম শিক্ষাপ্রাঙ্গণ বা ক্যাম্পাসটি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। প্রথাগত শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তে এই প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম মেধা বা এআই-নির্ভর শিক্ষণ প্রক্রিয়ার ওপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করিয়াছে। বর্তমানে অস্টিন ব্যতীত মিয়ামি, সান ফ্রান্সিসকো এবং স্কটসডেল-সহ আমেরিকার বিভিন্ন প্রধান নগরীতে এই বিদ্যালয় নেটওয়ার্কের শাখা বিস্তৃত হইয়াছে। উল্লেখ্য যে, এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার বার্ষিক ব্যয়ভার বা শিক্ষণ-শুল্ক ক্যাম্পাস ভেদে আনুমানিক ৪০ হাজার হইতে ৭৫ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যবর্তী, যাহা বর্তমান শিক্ষা-মানচিত্রে ইহাকে এক অভিজাত ও ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় অভিষিক্ত করিয়াছে। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ক্যামেরন সোরসবি সমাজমাধ্যমে জানাইয়াছেন যে, তাঁহারা এমন এক প্রশিক্ষক দল গঠন করিতেছেন যাঁহারা পুঁথিগত বিদ্যা বা গৃহকর্মের পরিবর্তে সরাসরি ব্যবসার ময়দানে শিক্ষার্থীদের পথপ্রদর্শন করিবেন। লাভের খতিয়ান বিশ্লেষণ করা হইতে শুরু করিয়া বিপণন কৌশল নির্ধারণ— সমস্তই হাতেকলমে শিখানো হইবে। যদি এই ‘আগ্রাসী’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হয়, তবে ৪০-৮০ হাজার ডলারের সম্পূর্ণ ফি অভিভাবকদের ফিরাইয়া দেওয়া হইবে।


তবে এই ঝকঝকে প্রতিশ্রুতির আড়ালে কিছু প্রশ্নও থাকিয়া যায়। শিক্ষা কি কেবলই অর্থ উপার্জনের সোপান? শৈশব হইতে কোটিপতি হইবার এই তীব্র প্রতিযোগিতা কি শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলিবে? যদিও বিদ্যালয়ের পক্ষ হইতে দাবি করা হইয়াছে যে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী এই পদ্ধতিতে আনন্দিত, তথাপি শিক্ষার এই বাণিজ্যিকীকরণ ও কৃত্রিম মেধার একাধিপত্য লইয়া শিক্ষামহলে বিতর্ক অনিবার্য। টেক্সাস প্রদেশের অস্টিন কেন্দ্রিক এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা আগামী দিনে বিশ্বশিক্ষার মোড় ঘুরাইয়া দেয় কি না, তাহাই এখন দেখিবার বিষয়।

লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে?

লেখক পরিচয় |

Start typing and press Enter to search