বহুত্বের একত্বে পরিবর্তন
বাঙালী নিশ্চিতভাবেই বিস্মৃত হন নাই যে কোন এক যুগে রাজনৈতিক প্রভুদের মুখে প্রায়ই শোনা যাইত বহুত্বের জয়গান। কর্মটি আপনি করিলেও কর্তাটি প্রায়ই ‘আমরা’ দ্বারা ভূষিত হইতেন। এই ‘আমরা’একটি বহুত্ব ব্যঞ্জক শব্দ। নিন্দুকেরা এই ‘আমরা’ র সহিত রামায়নের সকল দুষ্কর্মের নায়ক রাবণের মিল পাইতেন। রাবণের দশটি মাথা থাকিলেও বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদি একটি মানুষেরই ছিল। ফলতঃ রাবণ দশ মাথার মায়া দেখাইলেও ভিলেন খুঁজিবার জন্য রামায়ন পড়ুয়াদের খুব একটা মাথার ঘাম পায়ে ফেলিতে হইত না। রাজনৈতিক প্রভুদের মুখের সেই ‘আমরা’-ও সাধারন মানুষের কাছে বহুত্বের ধারনার ভিতরে সেই গোপন এক-এর কথাই প্রকাশ করিত। ‘আমি করি নাই’, ‘দায়ী আমরা’- এই বোধটি তাহাদের নিজস্ব কর্মের জন্য কাহারও নিকট ব্যাক্তিগত Accountability হইতে মুক্ত রাখিত।
এছাড়াও ‘আমরা’ শব্দটির আরো একটি প্রচ্ছন্ন ব্যাপ্তি ছিল। অক্টোপাসের একাধিক শুন্ডের কোনটি কাটিলে অক্টোপাস পরাজিত হইবে তাহা যেমন বুঝিতে পারা যায় না, ঠিক তেমনই ‘আমরা’ শব্দটির বহুত্বব্যাঞ্জক অর্থটি প্রকৃত দুর্বলতাকে আড়াল করিয়া প্রভুদের রক্ষা করিত। তাহার পর দিন বদলাইয়াছে। গঙ্গা দিয়া অনেক জল বহিয়া গিয়াছে। সামাজিক চাকাটি ঘুরিয়াছে।
গনতান্ত্রিক ‘আমরা’র প্রভাবে রাজনৈতিক ‘আমরা’ শক্তির পতন ঘটিয়াছে। পূর্বাকাশে এক নূতন সূর্য থুড়ি শব্দের উদয় হইয়াছে। ইহা ‘আমি’। ভারে পূর্বসুরি ‘আমরা’ অপেক্ষা কিঞ্চিত ক্ষুদ্র হওয়া সত্ত্বেও, ‘আমি’ ধারে বৃহৎ। এ ‘আমি’ বাঙালীর নিকট কিঞ্চিত নতুন আমি। এ ‘আমি’, ‘আমরা’-র এড়াইয়া যাইবার, রহস্যের বাতাবরনে নিজেকে আড়াল করিবার দায়মুক্ত। এই নতুন ‘আমি’ সদর্পে ঘোষনা করিল যে আমার ‘আমিত্বেই’ ব্রক্ষ্মান্ড সুপ্ত। আমি-ময় এই নতুন concept বাঙালী দ্রুত, বড় দ্রুতই গ্রহণ করিল। ‘আমরা’-র পূজারীরা দ্রুত ‘আমি’-র ব্যজনাতে মজিলেন।
পূজারীদের সুবিধা হইল। এতকাল সেই একমেবাদ্বিতীয়ম রাজনৈতিক ‘ঈশ্বরের’ শারিরীক অনুপস্থিতিতে তাহারাই ছিলেন রক্তমাংশের ‘মিনি- ঈশ্বর’। ভক্তের অর্ঘ্য গ্রহণপূর্বক নানাবিধ আশীর্ব্বাদ তাহারা বর্ষণ করিতেন। অনুপস্থিত ‘ঈশ্বর’ তাহাদের বহু কাজের সাফাইদার থাকিতেন। কিন্তু এই নূতন জলজ্যান্ত ‘আমি’র অনুপ্রবেশে আম আদমীর সন্নিকটে সেই সবর্শক্তিমান ‘ঈশ্বর’ সশরীরে সদম্ভে উপস্থিত হইলেন। পূজারীদের ঈশ্বর সাজিবার প্রয়োজনীয়তার অবসান ঘটিল। পূজারীরা শুধুমাত্র ঈশ্বর মানে সেই ‘আমি’-ময় অস্তিত্বের অর্চনাতেই ব্রতী হইলেন। ঈশ্বর দান আপন হস্তে গ্রহন করেন না। অগত্যা বাধ্য হইয়াই পূজারীরা এই দান গ্রহনের দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন!
দিন চলিয়া যাইতেছে। প্রতি মুহূর্তেই নতুন আমি আরো ব্যাপ্ত হইতেছে। সমাজের সর্বস্তরে যেখানেই তিলমাত্র সুযোগ আছে সেখানেই, এই আমি -“আমাকে দেখুন, এই যে আমি, ইহা করিয়া দিলাম, আমার ইচ্ছা ইহা হইবে, আমার কথাটি শুনুন, আমাকে দেখুন, আমাকেই দেখুন, আর কাহাকেও নহে ইত্যাদী ইত্যাদী “- এসবের দ্বারা আমিত্বের সর্বব্যাপী প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিতেছেন। ‘আমি’-ময় আকার এবং তাহার পূজারী প্রতিনিধিদল চমৎকার একটি টিমওয়ার্কের মাধ্যমে আম আদমীর পূজা গ্রহণ করিয়া চলিতেছেন। ‘আমরা’ এবং ‘আমি’র এই খেলায় পরিবর্তন শুধু একটি জায়গায় চরমভাবে প্রতীয়মান। ক্ষেত্র টি হইল মুখের। রামায়ন গিয়া মহাভারত আসিয়াছে, রাবনের স্থলে এক্ষণে দূর্যোধন এর রমরমা হইতেছে। কিন্তু সংবিধানবর্ণিত সেই “We the people of India …” র ‘আমরা’ ক্রমশঃ চলচ্ছক্তি হারাইতেছে। গনতন্ত্রের দেবী পাশ ফিরিয়া নিদ্রা দিতেছেন।
কিন্তু ভুলিলে চলিবেনা যে চাকাটি ঘুরিতেছে৷ বর্তমানের রবরবা চিরকাল থাকে না। নিঃশব্দে সময়ের চাকাটি ঘুরিয়া বর্তমানকে অতীতের আবর্জনায় ছুড়িয়া ফেলে। যে ‘আমরা’, ‘আমিত্বে’-র গরিমায় এক্ষণে দিনমানে চন্দ্রমার ন্যায় বিবর্ণ হইয়া আছে উহা আসলে নখদন্তহীন বৃদ্ধ শার্দুলের ন্যায় জঙ্গলের গভীরে সময় মাপিতেছে। সময়ও ধীরে ধীরে ১২টার দিকেই আগাইতেছে।







